ধান সেদ্ধ করে শুকিয়ে অতি পবিত্র নিয়মে ঢেঁকিতে ভেঙে এই চাল তৈরি হয়েছে। ‘আমার চাল নিলে না! কাঁদতে কাঁদতে এক সময় চোখ লেগে গেছে। স্বপ্ন দেখছেন। এক দেবী এসে গা ঠেলছেন, ‘ওঠ, ওঠ! এই শ্যামা ওঠ।
শ্যামাসুন্দরী চোখ মেলে চাইলেন। ওমা একি দেখছেন! দরজার পাশে পায়ের ওপর পা দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছেন এক দেবী। গায়ের রঙ টকটকে লাল। সেই দেবী বলছেন, ‘তুমি কাঁদছ কেন শ্যামাসুন্দরী? ওরা চাল নেয়নি তো কি হয়েছে? কালীর চাল আমি খাব। তোমার ভাবনা কি?’
আরও পড়ুনঃ ফোনে সিবিআই, ঘরে সিমবক্স! কলকাতা পুলিশের পর্দাফাঁস বিশাল টেলি জালিয়াতি চক্রের
শ্যামাসুন্দরী ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে মা?”
‘আমি জগদম্বা, জগদ্ধাত্রীরূপে তোমার পূজা নেবো।’
কি হলো! এ কি দেখলেন তিনি! স্বপ্ন না বাস্তব! সারদাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ রে সারদা! লাল রং, পায়ে পা ঠেসান দিয়ে ও কী ঠাকুর ?”
“ও তো জগদ্ধাত্রী।’
‘আমি জগদ্ধাত্রী পুজো করব।’ জগদ্ধাত্রী পুজো কি সহজ ব্যাপার। কঠিন পুজো। খরচও কম নয়। প্রতিমা, পুজোর নানা জিনিস সংগ্রহ। অত টাকা কোথায়! পরিবারের আর্থিক অবস্থা তো তেমন ভাল নয়। শ্যামাসুন্দরী ঘোরেন, ফেরেন আর কেবলই বলেন, ‘আমি জগদ্ধাত্রী পুজো করব।’ ঘোর লেগেছে—মা তাঁর পুজো নেবেনই বুঝি।
গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি থেকে পাঁচমন ধান আনালেন। আর কদিন পরেই পুজো। মা কালী গেলেন, আর কদিন পরেই ফিরবেন মা জগদ্ধাত্রী হয়ে। শুরু হলো অবিরাম, অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। সহজে থামবে, এমন আশা নেই। এ কি বাধা! শ্যামাসুন্দরী আকাশের দিকে তাকিয়ে অনন্তবাসী দেবীকে বললেন, ‘মা, কি করে তোমার পুজো হবে! ধানই যে শুকোতে পারলুম না ।
হঠাৎ ঘটে গেল সেই অলৌকিক ব্যাপার। চারপাশে অঝোরে বৃষ্টি, শ্যামাসুন্দরী যেখানে চাটাই পেতে ধান শুকোতে দিয়েছিলেন, সেই জায়গাটি রোদে ভাসছে। এক চাটাই সোনা রোদ। শ্যামাসুন্দরী অবাক হয়ে মেয়েকে বললেন, ‘ও সারদা! এ কি ব্যাপার!’
‘মা জগদ্ধাত্রী তোমার পূজা নেবেনই। কালীর চাল মা জগদ্ধাত্রী খাবেন যেমন তোমাকে বলেছিলেন। মায়ের কথা মিথ্যা হবার নয়।’
আগুন জ্বালিয়ে প্রতিমা শুকনো হলো, চাপল লাল রঙ। স্বপ্নে দেখা সেই দেবী! শ্যামাসুন্দরী পুত্র প্রসন্নকে বললেন, ‘একবার দক্ষিণেশ্বরে যা, আমার জামাইকে নিয়ে আয়।’ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ শুনে বললেন, “মা আসবেন? মা আসবেন? বেশ বেশ। তোদের বড় খারাপ অবস্থা ছিল যে রে!’
প্রসন্ন বললেন, ‘আপনি যাবেন, আপনাকে নিতে এলুম।’ ঠাকুর বললেন, ‘এই আমার যাওয়া হলো। যা বেশ, পূজা করগে। বেশ বেশ তোদের ভাল হবে’।
সাড়ম্বরে জগদ্ধাত্রী পুজো হলো। চারপাশের গ্রামের বহু মানুষ আমন্ত্রিত হলেন। সেও এক অলৌকিক ব্যাপার! ওই পাঁচ মন ধানের চালেই সব কুলিয়ে গেল, হেসে খেলে। বিসর্জনের সময় সরলপ্রাণা শ্যামাসুন্দরী প্রতিমার কানে কানে বলে দিলেন, ‘মা জগাই আবার আর বছর এসো। আমি তোমার জন্যে সমস্ত বছর ধরে সব যোগাড় করে রাখব।’
পরের বছর শ্যামাসুন্দরী পুজোর আগে মা সারদাকে বললেন, ‘দেখ, তুমি কিছু দাও, আমার জগাইয়ের পুজো হবে।
মা বললেন, ‘অত ল্যাঠা আমি পারব না। একবার পুজো হলো হলো, আবার ল্যাঠা কেন? দরকার নেই, ও দায়িত্ব আমি নিতে পারব না ।’
বললেন বটে, মা জগদ্ধাত্রী কিন্তু মুক্তি দিলেন কই। স্বপ্ন এল। স্বয়ং জগদ্ধাত্রী এবং তার দুই সখী -জয়া আর বিজয়া । তিনজনে পর পর দাঁড়িয়ে | । সে কি আলো। ঝলমল করছে।সে কি দৃশ্য!
তাঁরা সমস্বরে বললেন, ‘আমরা তাহলে যাব!’
ধ্বনি, প্রতিধ্বনি! যেন আকাশের কণ্ঠস্বর, “কি বলো? আমরা তা হলে যাব?’
মা সারদার খুব মজা লেগেছে, অভিমান দ্যাখো! ওই যে বলেছি, ‘ল্যাঠা’। রাগ হয়েছে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তোমরা?’
দেবী বললেন, ‘আমি জগদ্ধাত্রী।’
মা তখন অতি মাত্রায় সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন, ‘সে কি? না, না, তোমরা কোথা যাবে? তোমরা থাক। তোমাদের তো যেতে বলিনি।’
এবার মা জগাই আর শ্যামাসুন্দরীর কাছে নয় এসেছেন মা সারদার কাছে। দেবী এসেছেন দেবীর কাছে, চিরকালের আসনটি পাকা করতে।
মা সারদা আবার বললেন, ‘তোমাদের তো যেতে বলিনি! কোথায় যাবে তোমরা? তোমরা এখানেই থাকবে।’
মা সারদার পিত্রালয়ে তখন লোকবল খুব কম। তাই পূজার আয়োজন করার জন্যে তিনি জয়রামবাটীতে চলে আসতেন। কায়িক শ্রমে মায়ের জুড়ি পাওয়া ভার। কাড়ি কাড়ি বাসন মাজা। একবার এদিকে ছুটছেন, একবার ওদিকে। ফর্দ মেলাচ্ছেন। দেখছেন, কি এল, কি না এল। এ আসছে, সে আসছে। উৎসবের বাড়ি। সর্বত্র মা সারদা। মা যেন মাখামাখি হয়ে আছেন। পরিশ্রমের অপর নাম—সারদা। ব্যবস্থাপনা, ম্যানেজমেন্ট এর অপর নাম সারদা।
পূজা তো একদিনেই শেষ করা যায়, চারদিন হলো কেন? প্রথম বছর বিসর্জনের দিন পড়ে গেল বৃহস্পতিবার। মা সারদা বললেন, না বৃহস্পতিবারে বিসর্জন হবে না। পরের দিন সংক্রান্তি, তার পরের দিন পয়লা। সুতরাং চতুর্থ দিন রবিবারে বিসর্জন হয়েছিল।
প্রথম চার বছর সঙ্কল্প হয়েছিল শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামে। দ্বিতীয় চারবছর মা সারদার নামে। তৃতীয় চার বছর মা সারদার খুল্লতাত নীলমাধবের নামে। বারো বছর পুজো হয়ে যাওয়ার পর মা আর একবার সিদ্ধান্ত নিলেন, সকলের
নামেই পূজা যখন হয়ে গেল, তখন এখানেই শেষ করা যাক। বেশ হলো, খুব হলো!
যে-দিন এমন ভাবলেন, সেই রাতেই স্বপ্ন। মা জগদ্ধাত্রী এলেন মা সারদার কাছে স্পষ্ট তাঁর জিজ্ঞাসা — ‘মধু মুখুজ্যের পিসিমা আমার পুজো করতে চাইছে সারদা! তবে আমি যাই? তিনবার জিজ্ঞেস করলেন। একই প্রশ্ন তিনবার।
মা সারদা বুঝলেন, দেবী তাঁকে দিয়ে ‘তিন সত্য’ করিয়ে চলে যেতে চাইছেন। তখন দেবীর পা দুটি জড়িয়ে ধরে তিনি বললেন, ‘মা, আমি যে আর ছাড়বো না তোমাকে। তুমি সারদার জগদ্ধাত্রী হয়ে এই জয়রামবাটীতে যুগযুগ বিরাজ করবে। আমি বছর বছর তোমাকে আনব মা।”
১৮৯৪ সালে প্রায় সাড়ে দশবিঘে চাষের জমি কেনা হলো। স্বামী সারদানন্দজীর অনুরোধে মাস্টারমশাই (শ্রীম) ওই বাবদ ৩২০ টাকা দান করলেন। ১৯১৬ সালের ৭ জুলাই কোয়ালপাড়া আশ্রমে ৺জগদ্ধাত্রীর নামে মা সারদার অপূর্ণনামা রেজিস্ট্রি করা হলো। মা জগাইয়ের পূজার পাকাপাকি ব্যবস্থা।
প্রথম পূজায় মায়ের প্রথম নির্দেশ মতো আজও তিন দিন পুজো হয়। প্রথম দিন ষোড়শোপচারে, পরের দুদিন সাধারণ ভাবে। দেবীর দুপাশে জয়া, বিজয়া। তাঁদেরও পূজা হয়। দরিদ্র ব্রাহ্মণীর আদরের ধন মা জগাই আজ ঐশ্বর্যশালিনী, রাজরাজেশ্বরী। মাতৃমন্দিরের গেরুয়া জ্বলজ্বলে সন্ন্যাসীরা যখন পূজায় বসেন লক্ষ ভক্তের দৃষ্টি স্থিরকার পূজা দেখছি! শ্রীরামকৃষ্ণের সারদা- সরস্বতী, স্বামী বিবেকানন্দের জ্যান্ত দুর্গা, সারদা-জগদ্ধাত্রী হয়ে বসে আছেন ।
তাঁর মেয়েটিকে তুমি চেননি। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, সেই অনন্তশক্তির কে বাছা তুমি! শ্যামাসুন্দরীর ‘কালীর চাল’ তুমি প্রত্যাখ্যান করেছিলে! বজ্র-আধার ‘প্রকৃতিং পরমাং’-এর ইচ্ছেতে সবই হয় । জগদ্ধাত্রীর ধ্যানমন্ত্র মাতৃমন্দির থেকে ঝঙ্কৃত হয়ে কালাকাল আচ্ছন্ন করেছে—ওঁ সিংহস্কন্ধাধিসংরূঢ়াং নানালঙ্কারভৃষিতাম্।
মাগো! ত্বমেব সর্বং সর্বস্থে জগদ্ধাত্রী নমোহস্তুতে।
‘ভক্ত কি দেখছ?’
‘মা জগদ্ধাত্রী!’
‘এবার কি?’
‘মা সারদা।’
“তাহলে?”
‘জানি না।’
স্বামীজী বলেছিলেন, ‘তোমরা কেউ জান না। জানবেও না, মা কে !’
‘দয়ারূপে দয়াদৃষ্টে দয়ার্দ্রে দুঃখমোচিনি।’









