জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)-র অন্দরে জোট রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ অবশেষে প্রকাশ্যে এল। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দলের মিডিয়া সেলের সম্পাদক ও যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন। তাসনিম জারার পদত্যাগকে ঘিরে এনসিপির অভ্যন্তরে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের হামলার ঘটনায় লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে প্রতিবাদ
তাসনিম জারার সঙ্গে একই দিনে পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁর স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহও। তিনি এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। খালেদ সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, “ব্যক্তিগত কারণে দল থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি।” শনিবার সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ তিনি দলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান। তবে দল ছাড়লেও রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না তিনি। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইল থেকে জানিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নারী নেতা দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতে ইসলামিসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে জোটের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, জ্যেষ্ঠ সদস্য সচিব নাহিদ সারোয়ার নিভা, যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনুভা জাবীন এবং যুগ্ম সদস্য সচিব নুসরাত তাবাসসুমের মতো নেত্রীরা দলীয় ফোরামে নিজেদের অসন্তোষের কথা তুলে ধরেছিলেন। তাসনিম জারার পদত্যাগ সেই ক্ষোভেরই বড় প্রতিফলন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তাসনিম জারা জানান, তাঁর স্বপ্ন ছিল কোনও রাজনৈতিক দলের প্ল্যাটফর্ম থেকে সংসদে গিয়ে ঢাকা-৯ আসনের মানুষের সেবা করার। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তিনি কোনও নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার অঙ্গীকার থেকে সরে আসছেন না বলেও স্পষ্ট করেছেন। সেই লক্ষ্যেই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের ময়দানে নামার ঘোষণা দেন।
আরও পড়ুনঃ SIR-এর দ্বিতীয় পর্যায় চালু, লক্ষাধিক ভোটারকে তলব, কী কী নথি মাস্ট?
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আগেই সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাসনিম জারা গণচাঁদার মাধ্যমে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে হলে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়। সে কারণেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের কাছে স্বাক্ষরের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যারা দলীয় প্রার্থী হিসেবে তাঁকে চাঁদা দিয়েছিলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কারণে চাইলে তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
এনসিপির অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের সিদ্ধান্তেই সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ ছিলেন তাসনিম জারা। ঢাকা-৯ আসনে তাঁকে জোটের প্রার্থী করার প্রাথমিক আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত সেই সমীকরণে জটিলতা তৈরি হয়। জারা পদত্যাগ করায় ওই আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে হুমায়রা নুরের নাম বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে জামায়াত ওই আসন ছাড়বে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে তাসনিম জারার পদত্যাগ শুধু একটি দলীয় সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে জোট বনাম স্বতন্ত্র রাজনীতির দ্বন্দ্বকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আসন্ন নির্বাচনে এই সিদ্ধান্ত কতটা প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।









