দেশের শহুরে গণপরিবহণ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চলেছে ভারত। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে দেশে নির্মিত সমস্ত ইনট্রা-সিটি বা শহরভিত্তিক সরকারি বাসে বাধ্যতামূলকভাবে লো-ফ্লোর ডিজাইন চালু করতে হবে। এই নির্দেশিকা কার্যকর হলে বাসের মাটি থেকে তলার উচ্চতা সর্বোচ্চ ৩৫০ মিলিমিটারের মধ্যে রাখতে হবে, যাতে যাত্রীদের ওঠানামা আরও সহজ ও নিরাপদ হয়।
আরও পড়ুনঃ ধর্নায় বসছেন শিলিগুড়ির বিধায়ক! চিঠি মুখ্যমন্ত্রীকেও
এই সিদ্ধান্তকে শহুরে পরিবহণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি বড় সংস্কার হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশেষত বয়স্ক মানুষ, প্রতিবন্ধী যাত্রী, শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বাসে ওঠানামা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা ছিল। উঁচু সিঁড়ি, ভিড় এবং তাড়াহুড়োর মধ্যে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যেত। লো-ফ্লোর বাস চালু হলে এই সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি পোস্টে এই নতুন নির্দেশিকার কথা জানানো হয়েছে, যেখানে চেন্নাইয়ের এমটিসি-র একটি আধুনিক বৈদ্যুতিক লো-ফ্লোর বাসের ছবিও তুলে ধরা হয়েছে। বেগুনি ও সবুজ রঙের ওই বাসটি শুধু নকশাতেই নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও আধুনিক—যা ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিবহণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ইলেকট্রিক ভেহিকল ব্যবস্থার সঙ্গেও লো-ফ্লোর বাসের সংযুক্তি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই সিদ্ধান্ত একেবারে নতুন নয়। দিল্লি-সহ কয়েকটি বড় শহরে ২০১০ সাল থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে লো-ফ্লোর বাস চালু রয়েছে। সেসব শহরের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, যাত্রী ওঠানামার সময় প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন আর্বান মোবিলিটি স্টাডিতেও এই তথ্য উঠে এসেছে। দ্রুত বোর্ডিং ও ডিসএম্বার্কেশনের ফলে বাসের স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকার সময় কমে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ট্রাফিক ব্যবস্থার উপর।
তবে এই পরিবর্তন নিয়ে কিছু উদ্বেগও সামনে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে অন্তত একাধিক প্রতিক্রিয়ায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ভারতের অনেক শহরের রাস্তার বর্তমান অবস্থার সঙ্গে লো-ফ্লোর বাস কতটা মানিয়ে নিতে পারবে। বর্ষাকালে জল জমা, অসম রাস্তা, স্পিড ব্রেকারের উচ্চতা—এসব বিষয় বাসের তলা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। পরিবহণ দফতরের আধিকারিকদের দাবি, এই বিষয়গুলি মাথায় রেখেই নতুন মানদণ্ড তৈরি করা হচ্ছে এবং রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে রাস্তার পরিকাঠামো উন্নত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে! তুলকালাম শ্রীরামপুরে
অন্যদিকে, বাস নির্মাতা সংস্থাগুলির কাছেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন ডিজাইন, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা মান বজায় রেখে বাস তৈরি করতে প্রাথমিকভাবে খরচ বাড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমবে এবং যাত্রী সংখ্যা বাড়লে রাজস্বও বাড়বে—এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, লো-ফ্লোর বাস চালুর মাধ্যমে ভারতের শহুরে গণপরিবহণ ব্যবস্থা আরও আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব হওয়ার পথে এক ধাপ এগোল। ২০২৬ সালের পর দেশের বিভিন্ন শহরে যখন একের পর এক নতুন কাঠামোর বাস রাস্তায় নামবে, তখন তা শুধু যাতায়াতের অভিজ্ঞতাই বদলাবে না, বরং শহরের সামগ্রিক পরিবহণ সংস্কৃতিতেও এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।









