চন্দন দাসঃ
কোটি টাকার বাজেট, থিম লাইটিংয়ের চমক আর কর্পোরেট স্পনসরশিপের মায়াজালে তিলোত্তমার দুর্গাপুজো আজ বিশ্বজোড়া খ্যাতির অধিকারী। পঞ্চমীর রাত থেকেই যেখানকার রাস্তায় তিল ধারণের জায়গা থাকে না, সেই শহরের জৌলুস ও মণ্ডপের লাইন এড়িয়ে এক অন্য ছবি ধরা পড়ে বাংলার ক্যানভাসে। যেখানে রাজপ্রাসাদতুল্য মণ্ডপ নয়, দেবী দুর্গা আসেন আটপৌরে মাটির ঘরে। ঘরের দাওয়ায় আল্পনা, উঠোনে কাশফুলের দোলা আর শিউলি ঝরা ভোরে এই গ্রামীণ বাংলার পুজোই হলো শারদোৎসবের আসল প্রাণস্পন্দন।
শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে যখন থিমের মারপ্যাঁচে প্রতিমাকে খাঁচাবন্দি করে দেখা হয়, তখন গ্রামের পুজোয় সেই কৃত্রিমতার লেশমাত্র থাকে না। সেখানে পুজো মানে গোটা গ্রামের এক হয়ে যাওয়া। কত্তাবাবুর দালান হোক কিংবা বারোয়ারি তলার চালাঘর—সেখানে জাত-ধর্ম বা পরিচয়ের দেওয়াল ভেঙে সব মানুষ এক সুতোয় বাঁধা পড়েন। ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে নতুন জামার গন্ধে চারপাশ মেতে ওঠার সেই অনুভূতি শহরের এসি মণ্ডপে দাঁড়িয়ে পাওয়া অসম্ভব।
আজকের দিনে প্যান্ডেল হপিংয়ের প্রতিযোগিতায় ছুটতে ছুটতে আমরা হয়তো ভুলেই গিয়েছি যে, মাটির প্রতিমার গায়ের সেই সোঁদা গন্ধ আর ঢাকের বোলের আসল অনুরণন লুকিয়ে থাকে গ্রামের মেঠো পথেই। পুজোর চারটে দিন নাড়ু-নাড়কোল খাওয়ার আনন্দ, ধুনুচি নাচের উন্মাদনা আর প্রতিমা বিসর্জনের মিছিলে গ্রাম বাংলার মানুষের মুখে ফোটা সেই সরল হাসিই শহরের যাবতীয় জৌলুসকে ফিকে করে দেয়। কোটি টাকার লাইটিং হয়তো চোখ ধাঁধায়, কিন্তু গ্রামের মানুষের সেই নিখাদ আনন্দ ও তৃপ্তিই আমাদের শিকড়ের সন্ধান দেয়। কারণ, দেবী আরাধনার আসল জাঁকজমক রাজপ্রাসাদে নয়, বাঙালির নাড়ির টানে ঘেরা এই মাটির ঘরেই।


