সেশন সাহেবের সেই কড়াকড়ির পর থেকে বাংলা বনাম নির্বাচন কমিশনের সংঘাত এক অন্য মাত্রা পায়। বিশেষ করে বাম আমলের শেষ দিকে এবং বর্তমান সরকারের দশকে এই বদলির রাজনীতি বারবার শিরোনামে এসেছে।
টিএন সেশন বদলির ট্রেন্ড দেখিয়েছিলেন তারপর সেই ট্রেন্ডই বাংলায় ফলো করেছেন পরবর্তী নির্বাচন কমিশনাররা।
আরও পড়ুনঃ ফের রদবদল! এবার ৭৩ রিটার্নিং অফিসারকে বদলি কমিশনের
২০০৬ বিধানসভা ভোট। সেশন বিদায় নিলেও তাঁর জুতোয় পা গলিয়েছিলেন জেএম লিংডো। ২০০৬ সালের ভোটের আগে বাংলায় নজিরবিহীন কড়াকড়ি হয়। প্রায় ১৯ জন আইপিএস, এবং ৫ জন ডিএম-কে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়েছিল কমিশন।
২০০৯ লোকসভা নির্বাচন। ভোটের মুখে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা প্রধানকে। এছাড়া বীরভূম ও উত্তর ২৪ পরগনার এসপি-দেরও সরিয়ে দেওয়া হয়। তৎকালীন বিরোধী তৃণমূল ও কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, পুলিশ সরাসরি রাজনৈতিক ক্যাডারদের মতো আচরণ করছে। কমিশন তদন্ত করে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ামাত্রই বদলির নির্দেশ দেয়।
২০১১-র ঐতিহাসিক পরিবর্তন। তখন কমিশনের দায়িত্বে এস ওয়াই কুরেশি। ক্ষমতা পরিবর্তনের সেই নির্বাচনে কমিশনের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে চর্চিত। ভোটের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ডিজিপি নপরাজিত মুখোপাধ্যায়কে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। তাঁর বদলে নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্বে আনা হয় রঞ্জিত কুমার পচনন্দাকে। এছাড়া একাধিক জেলার এসপি এবং ডিএম-কে এক রাতে বদলি করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, পুলিশের একাংশ নির্দিষ্ট দলের হয়ে ছাপ্পা ভোট নিশ্চিত করার ছক কষছে। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কমিশন নজিরবিহীনভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রতিটি বুথে মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং স্থানীয় পুলিশের ক্ষমতা খর্ব করে।
২০১৪ লোকসভা। মুখ্যসচিব এবং ৫ জেলাশাসককে বদলির নির্দেশ দেয় কমিশন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিলেন—’পারলে আমায় গ্রেপ্তার করো, একটা অফিসারকেও সরাব না’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমিশনের আইনি শক্তির কাছে নতিস্বীকার করতে হয় নবান্নকে।
২০১৬ বিধানসভা। খোদ কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কমিশনের নির্দেশে রাতারাতি চেয়ার ছাড়তে হয় বহু আইপিএস অফিসারকে।
আরও পড়ুনঃ “ঝুলি থেকে বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে”, মমতার ‘কমিশন-বাণ’
১৯ থেকে ২১, বদলির নানান ট্রেলার চলে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ৪ পুলিশ সুপার এবং পুলিশ কমিশনারের বদলি ছিল স্রেফ ট্রেলার। আসল ছবি দেখা গেল ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে। কলকাতার সিপি থেকে অনুজ শর্মাকে সরানো, ডিজি বীরেন্দ্রকে সরিয়ে দেওয়া, এডিজি আইন-শৃঙ্খলা জাভেদ শামিমকে সরিয়ে জগমোহনকে আনা, এমনকি খোদ মুখ্যমন্ত্রীর সিকিউরিটি ডিরেক্টর বিবেক সহায়কেও সাসপেন্ড করে কমিশন। নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রীর চোট পাওয়ার ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগে নেওয়া হয়েছিল সেই চরম পদক্ষেপ।
টিএন সেশন যে চারাগাছ পুঁতেছিলেন, আজ ছাব্বিশে এসে তা বিশাল ডালপালা মেলেছে। মুখ্যসচিব আর স্বরাষ্ট্রসচিবের বদলি সেই ইতিহাসেরই নবতম অধ্যায়। তবে প্রশ্নটা শুধু বদলির নয়, প্রশ্নটা হলো, প্রশাসন কোথাও, কোনও রাজ্যেই, কি আদৌ নিরপেক্ষ হতে পারে? নাকি বদলটাই শুধু নিয়ম, বদলায় না কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের লড়াই?



