শিল্পী নয়, ‘পটুয়া’ পরিচয়ে বেশি পুলকিত হতেন যামিনী রায়। বাঁকুড়ার পোড় খাওয়া রাঙা মাটির সন্তান, গ্ৰামীণ লোকশিল্পের উত্তরাধিকার ছিল তাঁর চোখ দুটিতে আর রং-তুলির টানে। কালীঘাটের পটের ছবিকে বিশ্বের শিল্প মানচিত্রে আলোর আসনে বসিয়ে ছিলেন তিনিই। বাংলার ছবি, বাংলার লোকায়ত জীবনের চিত্রকরদের শিল্প ভাবনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলেন দুনিয়ার শিল্প রসিকদের।
আরও পড়ুনঃ লাগবে হেল্থ সার্টিফিকেট, ৫৫৪টি ব্যাঙ্ক শাখায় রেজিস্ট্রেশন! কেন্দ্রের তোড়জোড় শুরু অমরনাথ যাত্রার
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ১৯৩৯ সালে লেখা ‘Jamini Roy and The Tradition of Painting in Bengal’,… গভীর শিল্পদৃষ্টিসঞ্জাত, বাংলা ছবির ছড়ানো আঙিনায় যামিনী রায়ের জায়গা নিয়ে একটি প্রসারিত, বিদগ্ধ প্রবন্ধ। তিনি যখন ‘পরিচয়’ সম্পাদক ছিলেন তখনও যামিনী বাবুর ছবির আলোচনা সে পত্রিকায় বেরিয়েছে, তাঁর ছবিতে ‘পরিচয়’-প্রচ্ছদ শোভিত হয়েছে। তাঁর আগে যামিনী রায়ের ছবির এমন গভীর অবলোকন ও নিবিড় আলোচনা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
যামিনী রায়ের জন্ম ১১ এপ্রিল ১৮৮৭, অবিভক্ত বাংলার বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামের এক মাঝারি মাপের জমিদার পরিবারে । তাঁর বাবা, রামতরণ রায় ও মা নগেন্দ্রবালা দেবী।
আঁকাজোকার হাতেখড়ি তাঁর বাবা, স্বভাব শিল্পী, রামতারণ রায়ের কাছে, বাকুঁড়ার বেলিয়াতোড়ের বাড়িতে, তারপরে মাত্র ১৬ বছর বয়সে কলকাতার আর্ট কলেজে। তাঁর শিক্ষকেরা নিতান্তই কম বয়সী এই কিশোরের অঙ্কনধারার মৌলিকত্বে একটু আশ্চর্যই হন। আর্ট কলেজে ইতালীয় শিল্পী গিলার্দি, অধ্যক্ষ পার্সি ব্রাউনের সংস্পর্শে পাশ্চাত্যের প্রভাব তাঁকে মানতেই হয়েছিল, কিন্তু তা ছিল নিতান্তই সাময়িক। তখন যে-সব ছবি তিনি এঁকেছেন তাতে সেজান, ভ্যান গগ বা গগ্যাঁ-র নিরীক্ষাধর্মীতার ছাপ স্পষ্ট ছিল। তবে সে অধ্যায়ের ছবিতে, তাঁর রং-তুলি স্বচ্ছন্দ ছিল না, তিনি যা বলতে চাইতেন তার অনেকটাই অ-বলা, অস্পষ্ট থেকে যেতো। ফার্সি চিত্রকলার অনুশীলনেও তিনি কিছুটা সময় দেন। তবে সঠিক সময়ে যামিনী রায় বুঝেছিলেন পাশ্চাত্য শিল্প প্রভাবিত পথ তাঁর নয়, শিল্প সৃজনের তৃপ্তি বা ক্ষিদে কোনোটাই ও পথে মিটবে না। দ্রুত সরে এলেন, প্রাচ্যের অন্তরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্বতন্ত্র শিল্পসত্তায় যখন তাঁর অভিষেক ঘটলো , তখন থেকেই আমরা পরিচয় পেতে শুরু করলাম যামিনী রায়ের হাতের জাদু ও প্রতিভার মৌলিকতার। এ পর্বে অবশ্যই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নব্য-বঙ্গীয় চিত্রকলা, তাঁর ছবি-ভাবনা ও তার নিজস্ব আঙ্গিক নির্মাণে সহায়ক হয়েছিল।
বাংলার লোকজ পুতুল, পশু পাখি প্রাণী, ছোটো ছেলেমেয়েদের অপটু অঙ্কন, লোকায়ত জীবন, লৌকিক দেব দেবী, গ্ৰামীণ জীবন, বৃক্ষ তরুলতাপাতা ইত্যাদি স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে তাঁর ছবির ‘ফর্ম’ হিসেবে উঠে এলো। গ্রাম বাংলার সরলতা মাখানো মানুষের প্রাত্যহিক দুঃখ-সুখের জীবন, এমনকি রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীচৈতন্য, রাধা-কৃষ্ণ, যীশু ••• অতি পরিচিত প্রত্যক্ষ বাস্তব অনন্য শিল্প মাধুর্যে শোভিত হয়ে নব কলেবর পেলো যামিনি রায়ের অঙ্কন বৈভবে। কলকাতার কালীঘাটের পটশিল্পীদের ছবিতেও তিনি আকৃষ্ট হলেন। রেখার সহজ স্বছন্দ অনুসরণে বর্ণের গাঢ় উদ্ভাস এবং উজ্জ্বলতার সমন্বয় তাঁর ছবিতে রূপ-বৈচিত্রের যে ঐকতান এবং বোধের যে বিরল স্বর্গীয় সুষমা নির্মাণ করে তা এককথায় অবর্ণনীয়। কেবল চোখ আর মন দিয়ে তা দেখতে ও বুঝতে হয়।
অথচ দুর্লভ ও মূল্যবান তাঁর শিল্পের মাধ্যম নয়,
আরও পড়ুনঃ ভয়ঙ্কর বিপর্যয়! যমুনাতে যাত্রী নিয়ে ডুবে গেল নৌকা
শেকড়-বাকড় , ভূষোকালি, খড়িমাটি, গাছপালার নির্যাস থেকে, নিজের মতো করে, নিজের হাতে তৈরি করা রং। ক্যানভাসও অতি সাধারণ। তাতেই সৃষ্টি এইসব মহামূল্যবান চিত্রসামগ্ৰী। দরিদ্র দেশ, দরিদ্রতর শিল্পী, কিন্তু অনিন্দিত, অমূল্য ঐশ্বর্যবান তাঁর সৃজিত শিল্পের সম্ভার। স্বল্প মূল্যেই তিনি বিক্রি করতেন, সহজেই সেসব পৌঁছে যেতো দেশে বিদেশে। বিদেশ থেকে কয়েকবার ডাক এসেছে, তাঁর কথা, তাঁর শিল্পের কথা, বাংলা তথা ভারতের শিল্পবৈভবের পরম্পরার কথা বলবার জন্যে, আমন্ত্রণ নেননি। দেশের মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন, দেশের মাটির স্পন্দন জেগেছে তাঁর শিল্পে। ১৯১৮-১৯ থেকে তাঁর ছবি ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টের পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল। ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্ট্রিটে যামিনী রায়ের ছবির প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন আর তার সঙ্গে কলকাতার প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকা ‘পরিচয়’-এ তাঁর শিল্পকৃতির বিশদ আলোচনা হওয়ার ফলে তাঁর ছবির আরও পরিচিতি ছড়ায়। বাংলা পেয়ে যায় এক বিস্ময়কর চিত্রশিল্পীকে যাঁর হাতের আঁচড়ে একে একে যুগান্তকারী ছবির জন্ম হতে থাকে ‘মা ও শিশু’, ‘রাঁধা-কৃষ্ণ’, ‘যিশু’, ‘সাঁওতাল জননী ও শিশু’, ‘মাদলবাদনরত সাঁওতাল’, ‘নৃত্যরত সাঁওতাল’, ‘চাষির মুখ’, ‘পূজারিণী মেয়ে’, ‘কীর্তন’, ‘বাউল’, ‘গণেশ জননী’, ‘তিন কন্যা’, ‘কনে ও তার দুই সঙ্গী’ ও ইত্যাদি।
যামিনী রায়, তাঁর কাজের স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছেন, ১৯৫৪ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’, ১৯৫৫ সালে দেশের চারু শিল্পের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান,ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৫৬ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-লিট, সর্বোপরি শিল্পরসিকদের অসীম, অঢেল প্রশস্তি। বাংলার শিল্পভূমিকে উর্বরতা দান করে তিনি যে বৃক্ষরাজের উচ্চতা অর্জন করেছিলেন তা অবিস্মরণীয় আখরে লেখা থাকবে চিরকাল। কবি, অধ্যাপক, শিল্প সমালোচক, বুদ্ধদেব বসু, যামিনী রায়ের শিল্প প্রতিভায় আপ্লুত ও তাঁর শিল্পরীতির স্বাতন্ত্র্য ও নবীনতায় মুগ্ধ হয়ে কবিতায় তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেছিলেন, যার সঙ্গে আপামর শিল্পরসিক বাঙালিরও প্রণাম সম্মিলিত হয়েছে :
“আমরা সবাই প্রতিভারে করে পণ্য
ভাবালু আত্মকরুণায় আছি মগ্ন,…..
পুঁথি ফেলে তুমি তাকালে আপন গোপন মর্মতলে,
ফিরে গেলে তুমি মাটিতে, আকাশে, জলে।
স্বপ্ন লালসে অলস আমরা তোমার পুণ্যবলে
ধন্য যামিনী রায়।”



