রাজনীতি কোনো এঁদো পুকুর নয় যে জল জমে থাকবে, এটা হলো বহতা নদী। আর এই নদীর বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে আছে বামেদের নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ির ইতিহাস। আজ যারা ৩৪ বছরের বাম শাসনের দোহাই দেন, তারা ভুলে যান যে এই ফ্রন্টের শরিক দলগুলোই একসময় একে অপরের রক্ত চেয়েছিল। ফরোয়ার্ড ব্লক আর আরএসপি-র মতো দলগুলো ছয়ের দশকে সিপিআই(এম)-এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল। এমনকি ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা হেমন্ত বসুর হত্যার দায় সরাসরি সিপিআই(এম)-এর ওপর চাপানো হয়েছিল। অর্থাৎ, বাইরের শত্রুর আগে বামেদের শত্রু ছিল ঘরের বামেরাই।
আরও পড়ুনঃ ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি NOTAM জারি; আকাশসীমায় বেসামরিক বিমান চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
একতার আড়ালে,সুবিধাবাদী রাজনীতি!
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়,বামেদের এই “একতা’র আড়ালে সবসময়ই একটা সুবিধাবাদী রাজনীতি কাজ করেছে“।
সত্তরের দশকে যখন রিগিংয়ের অভিযোগে সিপিআই(এম) বিধানসভা বয়কট করল, তখন তাদেরই বন্ধু দল আরএসপি সেই বিধানসভায় যোগ দিয়ে দিব্যি আসন গ্রহণ করল।সিপিআই তো একসময় ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করেছিল। ১৯৮০ সালে ভাতিন্ডা কংগ্রেসের পর,যখন তারা বুঝল গদি বাঁচাতে বামফ্রন্টে আসা দরকার। তখনই,তাঁরা ‘শ্রেণী সহযোগিতা’র তত্ত্ব ঝেড়ে ফেলে শরিক হতে দৌড়ে এল। এই সুযোগসন্ধানী মনোভাবই বামেদের নৈতিক ভিতটা নড়িয়ে দিয়েছিল।
সেলিম-হুমায়ুন সাক্ষাৎ!
সাম্প্রতিক মহম্মদ সেলিমের সঙ্গে হুমায়ুন কবিরের আলাপ নিয়ে যাঁরা ফেসবুকে ঝড় তুলছেন বা নেতৃত্বকে অসম্মান করছেন,তাঁরা আসলে রাজনীতির আসল অংকটাই বোঝেন না।সেলিমবাবু পরিষ্কার বলেছেন, “সংবাদমাধ্যমের চশমা দিয়ে না দেখে সরাসরি বিষয়গুলো বুঝতে হবে।” অথচ,একদল লোক ঘরে বসে,নেটমাধ্যমে নিজেদের নেতৃত্বের দিকে আঙুল তুলছে।এই ধরনের আচরণ যে,উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বামেদের আরও পতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে,তা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। নিজের দলের সেনাপতিকে খাটো করে কোনো যুদ্ধে জেতা যায় না।
আরও পড়ুনঃ ভয়ঙ্কর ঘটনা বঙ্গে! কোচবিহারের শীতলকুচি লালবাজার এলাকায় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল ব্রিজ
রাজনৈতিক কৌশলগত দিক
এই বামপন্থার ইতিহাসেই চরম বাস্তববাদী কৌশলের উদাহরণ আছে। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সময়,নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাবা) যখন হিন্দু মহাসভা ত্যাগ করলেন,তখন তাঁকে বর্ধমান লোকসভা আসনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিয়েছিল পার্টি।মুজফর আহমেদ, প্রমোদ দাশগুপ্ত বা বিনয় চৌধুরীদের মতো প্রবীণ বাম নেতারা সেদিন কোনো ভুল করেননি।তাঁরা জানতেন রাজনীতির ময়দানে শত্রু দমনে,কাকে কখন পাশে নিতে হয়।আজ যাঁরা অতি-বিপ্লবী সাজছেন, তাঁরা যদি এই কৌশলগুলো বুঝতেন,তবে হয়তো বামেদের এই হাল হতো না।
আসলে,বামেদের পতনের বীজ বোনা হয়েছিল তাদের নিজেদের ঘরের কোন্দলেই। যখনই কোনো সংকট এসেছে, শরিকরা এক হওয়ার বদলে একে অপরের পা টেনে ধরেছে। আজকের এই সোশাল মিডিয়া ট্রোলিং বা নেতৃত্বের অবাধ্যতা সেই পুরনো অসুখেরই নতুন রূপ।
“ইতিহাস সাক্ষী,বামেদের বাইরের কোনো শক্তি যতটা না ক্ষতি করেছে,তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করেছে তাদের অভ্যন্তরীণ অহং আর ভুল বোঝাবুঝি। তাই সত্যি এটাই— বামেদের পতনের জন্য বামেরাই দায়ী, বাম শত্রু আসলে বাম নিজেই।”









