কলকাতার এক পুরনো পাড়ায়, সংকীর্ণ গলি আর লাল ইটের বাড়ির মাঝে থাকতেন এক মানুষ—নাম তাঁর গৌরমোহন দত্ত। সময়টা তখন ব্রিটিশ শাসনের দিন। দেশের বাজার ভরে আছে বিদেশি জিনিসে। ভারতীয়দের নিজের তৈরি কিছু ব্যবহার করার সুযোগ খুবই কম।
গৌরমোহন দত্ত এই দৃশ্য দেখে প্রায়ই ভাবতেন—
“আমাদের দেশের মানুষের ছোটখাটো ক্ষত, ফাটা হাত, শীতের জ্বালা—এসবের জন্য কি আমরা নিজেরা কিছু বানাতে পারি না?”
এই প্রশ্নই একদিন জন্ম দিল এক ছোট্ট সবুজ টিউবের।
আরও পড়ুনঃ আকাশে বোমাতঙ্ক! দিল্লি থেকে বাগডোগরাগামী ইন্ডিগোর বিমানে, চলছে জোরদার তল্লাশি
১৯২৯ সাল। কলকাতায় ছোট্ট একটি কারখানা। দিনের পর দিন পরীক্ষানিরীক্ষা চলতে লাগল। কখনো মলম বেশি শক্ত, কখনো বেশি পাতলা। কখনো আবার ত্বকে জ্বালা দিত। কিন্তু গৌরমোহন দত্ত হাল ছাড়লেন না। অবশেষে একদিন তৈরি হলো এমন এক ক্রিম, যা ক্ষত সারায়, ত্বক নরম রাখে, আর সংক্রমণ থেকে বাঁচায়।
নাম দেওয়া হলো—বোরোলিন।
নামটা খুব সাধারণ, কিন্তু কাজটা অসাধারণ।

শুরুর দিকে মানুষ সন্দেহ করত। বিদেশি ওষুধ ছাড়া কি কাজ হবে? কিন্তু ধীরে ধীরে গল্প ছড়াতে লাগল।
পাড়ার এক দিদার ফাটা হাত সেরে গেল।
এক শিশুর ছোটখাটো ক্ষত ভালো হলো।
শীতের রাতে ঠোঁট ফাটার যন্ত্রণা কমে গেল।
সবাই বলত,
“ওই সবুজ টিউবটা দাও তো!”
দেশ তখন স্বাধীনতার লড়াইয়ে উত্তাল। মানুষ যেমন স্বাধীনতা চাইছে, তেমনই চাইছে নিজের জিনিস। বোরোলিন হয়ে উঠল স্বদেশী ভাবনার এক নীরব সৈনিক। কোনো স্লোগান নয়, কোনো বড় দাবি নয়—শুধু কাজ দিয়ে প্রমাণ।
আরও পড়ুনঃ ‘মমতার মাসতুতো ভাই ফিরহাদ’, বিস্ফরক হুমায়ুন!
সময় গড়াতে লাগল।
বাবার আলমারিতে রাখা বোরোলিন একদিন চলে এল ছেলের স্কুলব্যাগে।
মায়ের ড্রেসিং টেবিল থেকে তা পৌঁছে গেল নাতনির হাতে।
টিউবটা বদলায়নি। সবুজ রং, কালো ঢাকনা—সব একই রয়ে গেল। বদলাল শুধু সময়।
নতুন নতুন ক্রিম বাজারে এলো। চকচকে বিজ্ঞাপন, বড় বড় প্রতিশ্রুতি। কিন্তু শীতের রাতে যখন হাত ফাটে, বা হঠাৎ কেটে যায় আঙুল—তখন মানুষ এখনো বলে ওঠে,
“বোরোলিন আছে?”
আজ প্রায় একশো বছর পেরিয়ে গেছে। গৌরমোহন দত্ত আর নেই, কিন্তু তাঁর ভাবনা রয়ে গেছে প্রতিটি সবুজ টিউবে। বোরোলিন আজ আর শুধু একটি ক্রিম নয়—এ এক স্মৃতি, এক বিশ্বাস, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে চলা গল্প।
একটি ছোট্ট সবুজ টিউবের গল্প।
যার ভেতরে লুকিয়ে আছে যত্ন, ভরসা আর দেশীয় গর্ব।








