চাঁদের দক্ষিণ মেরুকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার সূচনা যে ভারতের হাত ধরেই – তা আজ আর অজানা নয়। প্রায় দুই দশক আগে চন্দ্রযান-১ চাঁদের এই অঞ্চলের গুরুত্ব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিল। এবার সেই একই দক্ষিণ মেরুকেই লক্ষ্য করে আরও বড় মিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। ইসরোর পরবর্তী অভিযান চন্দ্রযান-৪, যার লক্ষ্য চাঁদের মাটি সংগ্রহ করে তা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা।
আরও পড়ুনঃ আত্মনির্ভর হওয়ার পথে দ্রুত এগোচ্ছে ভারত; আর বাইরে থেকে সবজি ফল আমদানি নয়! জানাল মোদী সরকার
ইসরো সূত্রে জানা গিয়েছে, চন্দ্রযান-৪-এর জন্য দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি একাধিক সম্ভাব্য অবতরণস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ নজরে রয়েছে মঁস মুটোঁ – চাঁদের সর্বোচ্চ পর্বত এবং দক্ষিণ মেরুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল। শিবশক্তি পয়েন্টের অভিজ্ঞতার পর এবার আরও নির্ভুল ও ঝুঁকিমুক্ত অবতরণের দিকেই এগোচ্ছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা।
চন্দ্রযান-২ অরবিটারের তোলা অতিস্পষ্ট ছবি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকায় ভূমির ঢাল, পাথরের ঘনত্ব, সূর্যালোকের প্রাপ্যতা এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক অঞ্চল চিহ্নিত করছেন। লক্ষ্য একটাই – এমন একটি জায়গা বেছে নেওয়া, যেখানে একদিকে নিরাপদে অবতরণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক দিক থেকেও মিলবে সর্বোচ্চ তথ্য।
বিশ্বের মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কাছে চাঁদের দক্ষিণ মেরু এখন সবচেয়ে মূল্যবান অঞ্চল। এই এলাকায় রয়েছে প্রাচীন ভূত্বক, এমনকি স্থায়ী ছায়াচ্ছন্ন গহ্বরে জল বা বরফ থাকার সম্ভাবনাও প্রবল। ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের বসতি গড়া, জ্বালানি উৎপাদন কিংবা গভীর মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে এই জল সম্পদ হতে পারে গেমচেঞ্জার।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০০৮ সালে চন্দ্রযান-১-এর মুন ইমপ্যাক্ট প্রোব দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি আছড়ে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠিয়েছিল। ২০১৯ সালে চন্দ্রযান-২ শেষ মুহূর্তে অবতরণে ব্যর্থ হলেও, ২০২৩ সালে চন্দ্রযান-৩ ইতিহাস গড়ে শিবশক্তি পয়েন্টে সফলভাবে নরম অবতরণ করে। এর ফলে দক্ষিণ মেরুর এত কাছাকাছি প্রথম সফল অবতরণকারী দেশ হয় ভারত।
এই ধারাবাহিক সাফল্য শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বৈজ্ঞানিক দাবির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। চন্দ্রযান-১ প্রথমবার চাঁদের পৃষ্ঠে জল অণুর অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছিল। সেই আবিষ্কারই বিশ্বজুড়ে দক্ষিণ মেরুকে গবেষণার কেন্দ্রে এনে দেয়। পরবর্তীতে আমেরিকা, চিন, রাশিয়া এবং একাধিক বেসরকারি সংস্থাও এই এলাকায় নজর ঘোরায়।
চন্দ্রযান-৪-এর জন্য যেসব অবতরণস্থল বিবেচনায় রয়েছে, তার মধ্যে মঁস মুটোঁ অঞ্চলের একটি এলাকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ইসরো বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৮৬ ডিগ্রি অক্ষাংশে অবস্থিত ‘এমএম-১’ নামে পরিচিত একটি অঞ্চল তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ, ঢাল মসৃণ এবং দীর্ঘ সময় সূর্যালোক পাওয়া যায়। রোবোটিক ল্যান্ডিংয়ের জন্য এই বৈশিষ্ট্যগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূল আমলে বার বার ধর্ষিত বাংলার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মেয়েরা! হুগলির চণ্ডীতলায় এ কি হল?
এই মিশনের চ্যালেঞ্জ শুধু অবতরণ নয়। চন্দ্রযান-৪ হবে ভারতের প্রথম চাঁদ থেকে নমুনা ফিরিয়ে আনার অভিযান। অবতরণের পর চাঁদের মাটি সংগ্রহ, তা সুরক্ষিতভাবে সিল করা, চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে ফের উৎক্ষেপণ, কক্ষপথে ডকিং এবং শেষে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন – প্রতিটি ধাপই প্রযুক্তিগতভাবে জটিল।
এই অভিযানের জন্য দুটি এলভিএম-৩ রকেট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পৃথিবীর কক্ষপথেই মহাকাশযানের বিভিন্ন অংশ জুড়ে দেওয়ার পর সেটিকে চাঁদের দিকে পাঠানো হবে। চন্দ্রযান-৩ যে নির্ভুল অবতরণ ও রোবোটিক অপারেশনের সক্ষমতা দেখিয়েছিল, চন্দ্রযান-৪ তার উপর আরও এক ধাপ এগোবে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরু থেকে আনা নমুনা বিজ্ঞানের কাছে অমূল্য। অ্যাপোলো বা সোভিয়েত লুনা অভিযানে যে নমুনা এসেছে, সেগুলি মূলত একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল থেকে। দক্ষিণ মেরুর প্রাচীন ও প্রায় অক্ষত ভূত্বক চাঁদের জন্ম, জলীয় উপাদানের ইতিহাস এবং সৌরজগতের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
২০২৮ সালের আশেপাশে চন্দ্রযান-৪ উৎক্ষেপণের সম্ভাবনা রয়েছে। তার পরেই জাপানের সঙ্গে যৌথ চন্দ্রযান-৫ বা লুপেক্স মিশনের পরিকল্পনা করছে ইসরো, যা আরও গভীরে দক্ষিণ মেরুতে জলবরফ অনুসন্ধান করবে।
প্রায় বিশ বছর আগে চন্দ্রযান-১ যেমন চাঁদকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল, চন্দ্রযান-৪ তেমনই আগামী দিনের চন্দ্র অভিযানের রূপরেখা তৈরি করতে চলেছে।









