বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তারাপীঠের সাধক বামাক্ষ্যাপা দুজনেই বীরভূমের মাটির সন্তান হলেও তাঁদের জগৎ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। একজন ছিলেন পরিশীলিত ব্রহ্মচর্চা ও সাহিত্যের উপাসক, অন্যজন মহাশ্মশানের এক অবধূত, যাঁর কাছে ভক্তিই ছিল শেষ কথা। এই দুই বিপ্রতীপ মেরুর মানুষের যখন সাক্ষাৎ হলো, সেই মুহূর্তটি ইতিহাসের পাতায় এক অমলিন আখ্যান হয়ে রইল।
আরও পড়ুনঃ অশান্তি শুরু দেশ জুড়ে; ভেনেজ়ুয়েলার পর মেক্সিকো, Mexico in Flames দেখে খুশিতে ডগমগ ট্রাম্প
শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রম থেকে তারাপীঠের দূরত্ব খুব বেশি নয়। লোকমুখে শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথ একবার কৌতূহলবশত বীরভূমের এই লৌকিক সাধকের সাথে দেখা করতে তারাপীঠে গিয়েছিলেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের সেই দিনটি ছিল যুক্তিবাদ আর মরমী সাধনার এক বিরল মেলবন্ধন।
১. “তুই নাকি গান করিস?”— সোজাসাপ্টা সম্বোধন
রবীন্দ্রনাথ যখন বামাক্ষ্যাপার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, সাধক তখন তাঁর নিজের খেয়ালে মগ্ন। কবির রাজকীয় ব্যক্তিত্ব বা পরিচিতি বামাক্ষ্যাপার কাছে কোনো আলাদা গুরুত্ব রাখেনি।
কথিত আছে, কবিকে দেখামাত্রই তিনি খুব সহজভাবে বলেছিলেন— “তুই নাকি খুব গান করিস? শোনা তো দেখি একটা!” বিশ্বের দরবারে সমাদৃত একজন কবির কাছে এমন ‘তুই’ সম্বোধন ছিল অভাবনীয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, যিনি সারা জীবন মানুষের সহজ রূপের সন্ধানী ছিলেন, তিনি এই সম্বোধনে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হননি। বরং তিনি বামাক্ষ্যাপার সেই অকৃত্রিম বাৎসল্য অনুভব করেছিলেন।
২. শ্মশানের হাওয়ায় রবি-সঙ্গীত
বামাক্ষ্যাপার অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ গান গাইতে শুরু করলেন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি গেয়েছিলেন— “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে”।
মহাশ্মশানের সেই রুক্ষ পরিবেশে, যেখানে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে তন্ত্রসাধনা চলে, সেখানে কবির ভরাট কণ্ঠের এই আত্মসমর্পণমূলক গানটি এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছিল। গান শুনে সাধক ক্ষ্যাপা শিশুর মতো দুলতে শুরু করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, এই কবির শব্দের গভীরেও সেই একই পরমাত্মার বাস।
৩. পাণ্ডিত্যের আভিজাত্য চূর্ণ
রবীন্দ্রনাথ পরে তাঁর বিভিন্ন লেখায় বা আলোচনায় এই ধরণের ‘সহজিয়া’ সাধকদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বুঝেছিলেন, তিনি যা কলম দিয়ে বর্ণনা করার চেষ্টা করছেন, বামাক্ষ্যাপা তা নিজের জীবন দিয়ে অনুভব করেছেন।
বামা তাঁকে কোনো উপদেশ দেননি, কোনো শাস্ত্র শোনাননি। কেবল তাঁর সোজাসাপ্টা ব্যবহার দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, পাণ্ডিত্যের ভার যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই প্রকৃত ভক্তির শুরু।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূলে মমতার অন্যতম ‘আস্থাভাজন’; বাংলার রাজনীতি ভাঙাগড়ার অন্যতম BJMUL পথ প্রদর্শক
কেন এই সাক্ষাৎটি গুরুত্বপূর্ণ?
এই সাক্ষাৎটি কেবল দুজন মানুষের মিলন ছিল না, এটি ছিল ‘বইয়ের জ্ঞান’ আর ‘জীবনের অভিজ্ঞতা’র আলিঙ্গন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ বা ‘ছিন্নপত্র’—এর পাতায় বারবার বাংলার এই বাউল-ফকির-সাধকদের সহজ পথের কথা বলেছেন। বামাক্ষ্যাপার সাথে তাঁর দেখা হওয়াটা যেন সেই দর্শনেরই এক জীবন্ত প্রয়োগ।
রবীন্দ্রনাথের ‘সহজিয়া’ জীবনদর্শনের মূলে এই ধরণের সাধকদের এক বড় ভূমিকা ছিল। বামা তাঁর কাছে কোনো অলৌকিক চরিত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন মাটির কাছের এমন এক মানুষ যিনি কোনো শাস্ত্র না পড়েও জীবনের চরম সত্যকে অনুভব করেছিলেন।
সাক্ষাৎ শেষে রবীন্দ্রনাথ যখন ফিরে আসছিলেন তখন তাঁর ডায়েরির পাতায় বা পরবর্তী লেখায় এই অভিজ্ঞতার ছায়া পাওয়া যায়। তিনি বুঝেছিলেন যে ব্রহ্মজ্ঞান কেবল শান্তিনিকেতনের উপাসনা গৃহের শান্ত পরিবেশে আবদ্ধ নয়। তা তারাপীঠের শ্মশানের ছাইয়ের মধ্যেও সমানভাবে বর্তমান। ভক্তি যেখানে সব হয়ে ওঠে সেখানে আচার বা শাস্ত্র কেবল একটি অছিলা হয়ে দাঁড়ায়।









