বাংলাদেশে ফের অস্থিরতার ছায়া। কট্টরপন্থী তরুণ নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে ঘিরে বৃহস্পতিবার রাত থেকে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক অরাজকতা। বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। পরিস্থিতি দেখে অনেকেরই মনে পড়ছে গত বছরের ৫ অগস্টের ভয়াবহ রাতের কথা।
এই পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশকে ‘জিহাদিস্তান’ বলে উল্লেখ করলেন তসলিমা নাসরিন।
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন এলাকার কালভার্ট রোডে টোটোয় চড়ে যাওয়ার সময়ে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা খুব কাছ থেকে গুলি চালায় ওসমান হাদির মাথায়। প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখান থেকে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের নিউরোসার্জিক্যাল আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়।
এরপর বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ঢাকার রাস্তায় স্লোগান উঠেছে, ‘আমিও হাদি হব, গুলির মুখে কথা কবো’। রাগে ক্ষোভে বিপুল সংখ্যক মানুষ যেন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। ওসমান হাদিকে নিয়ে আবেগ এমনই।
আরও পড়ুনঃ উত্তপ্ত বাংলাদেশ, চলে গেলেন জুলাই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ ওসমান; ফের ফুঁসে উঠল বাংলাদেশ
এমনই অবস্থার মধ্যে তসলিমা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যাতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি ভালুকার এক যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে মেরে, গাছে ঝুলিয়ে আগুনে দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার। যদিও সেই ভিডিওর সত্যতা ‘বঙ্গবার্তা’ যাচাই করেনি।
এই পোস্টের সঙ্গেই তসলিমা লেখেন, ‘একজন জিহাদির মৃত্যুর পরেই যেন গোটা বাংলাদেশ জুড়ে তাণ্ডব নামল। লক্ষ লক্ষ জিহাদি রাস্তায় নেমে যা সামনে পেয়েছে, ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আগুন ধরিয়েছে সর্বত্র—সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে।’
অর্থাৎ ওসমান হাদিকে সরাসরি ‘জিহাদি’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এবং ওসমান-পন্থীদেরও তেমনটাই বলেছেন।
পাশাপাশি, পুড়ে যাওয়ার ভিডিও পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘ভালুকার এক যুবক, দীপু চন্দ্র দাসকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তারপর তাঁর নিথর দেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। না—কারও চোখে জল ছিল না, কারও হাতে কাঁপুনি ধরেনি, কারও হৃদয় কেঁপে ওঠেনি। উল্টে “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর” ধ্বনি তুলে উন্মত্ত উল্লাসে চিৎকার করেছে তারা।’
আরও পড়ুনঃ জ্বলছে গোটা বাংলাদেশ! রাস্তায় সেনা, উদ্বেগজনক পরিস্থিতি; ওসমানের মৃত্যুতে মুখ খুললেন ইউনূস
এই প্রথম নয়, বাংলাদেশের কট্টরপন্থী ধর্মনীতি ও রাজনীতির বিরুদ্ধে এর আগেও বারবারই গলা তুলেছেন তসলিমা। মুসলিম সমাজের গোঁড়া অন্ধত্বের বিরুদ্ধে গলা তোলার দায়েই তাঁকে দেশও ছাড়তে হয়। তারপরেও ধারাবাহিক ভাবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে গলা তুলেছেন তসলিমা। দীপু দাসের খুন হওয়ার ঘটনাটিও খানিকটা তেমনই।
সূত্রের খবর, নবী মহম্মদ সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেন দীপু চন্দ্র দাস। তবে কোথায় কখন কীভাবে কার সামনে তিনি নবীকে অবমাননা করেছেন সে ব্যাপারে কেউই স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে বৃহস্পতিবার রাতে তাকে প্রথমে কারখানা থেকে বের করে মারধর করা হয়। তারপর অর্ধমৃত অবস্থায় একটি গাছে ঝুলিয়ে আরেক দফা লাঠিপেটা করার পর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় দেহে। এই ঘটনা ঘটে স্থানীয় এক মহাসড়কের পাশে। ফলে তীব্র যানজট ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়।
ভালুকা থানার ডিউটি অফিসার রিপন মিয়া রাতে সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, নবী সম্পর্কে কটুক্তি করার অভিযোগ ছিল ওই যুবকের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদে উত্তেজিত জনতা গণহত্যা করেছে।
বাংলাদেশে এমন ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক অতীতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একাধিক সংখ্যালঘু ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগের কোন সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সেই দিকেই ইঙ্গিত করে তসলিমা লেখেন, ‘এটাই জিহাদিস্তানের আসল চেহারা।’

প্রসঙ্গত, ওসমান ছিলেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে উঠে আসা এক ব্যতিক্রমী ছাত্রনেতা। বয়সে তরুণ হলেও ২০২৪ সালের ছাত্র অভ্যুত্থানের সময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র হিসেবে রাজপথে, মিছিলে এবং সামাজিক মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠ ছিল স্পষ্ট, ধারালো ও আপসহীন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তাঁর আশপাশের ছাত্র রাজনীতির পরিসরেই ওসমান হাদির উত্থান। প্রথম দিকে তিনি পরিচিত ছিলেন ছাত্র অধিকার, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার এক সংগঠক হিসেবে। ধীরে ধীরে তাঁর নেতৃত্বগুণ ও সংগঠনের ক্ষমতা তাঁকে ছাত্র রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে আসে।
এহেন হাদির মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরই ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় আবারও হামলার মুখে পড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন। বৃহস্পতিবার রাতে উগ্রবাদীদের একটি দল সেখানে চড়াও হয়। গত বছর ৫ অগস্টের ঘটনার পর থেকে এই নিয়ে পঞ্চমবার ওই বাড়িতে হামলা হল। বর্তমানে ভবনটির মাত্র এক-চতুর্থাংশ অবশিষ্ট থাকলেও শুক্রবার সকালেও সেখানে ভাঙচুর চালাতে দেখা যায় হামলাকারীদের।
ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার অফিসেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর জেরে শুক্রবার ওই দুই সংবাদপত্র ছাপা হয়নি। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বহু মানুষ ওই অফিস থেকে কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। গত বছর ৫ অগস্টে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে যে ধরনের লুটতরাজ চলেছিল, এই দৃশ্য তারই স্মৃতি উসকে দিচ্ছে। যদিও ‘বঙ্গবার্তা’ এই ভিডিওগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।









