আইএনটিটিইউসি নেতা শঙ্কর রাউতের ‘কীর্তি’র যেন শেষ নেই ! তোলা না-দেওয়ায় দলবল পাঠিয়ে ফ্ল্যাট থেকে জোর করে ব্য়বসায়ীকে তুলে নিয়ে গিয়ে ‘মারধর’ ও ‘শাসানি’র অভিযোগের ঘটনায় বরানগরের ‘দাপুটে’ এই তৃণমূল নেতার নাম জড়ানোয় অবাক হচ্ছেন না অনেকে । কারণ, এবারই প্রথম নয় !
বছর খানেক আগেও এই শঙ্কর রাউতের বিরুদ্ধেই উঠেছিল নিজের দলের ছাত্র নেতার সঙ্গে ‘অভব্য’ আচরণের অভিযোগ । সেই সময় প্রমোটারের হয়ে তিনি দলেরই স্থানীয় এক ছাত্র নেতাকে ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং হাত-পা ভেঙে দেওয়ার ‘হুমকি’ দিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন । যা ঘিরে তখনও কম জলঘোলা হয়নি । কিন্তু, তার পরেও ‘শঙ্কর’ আছেন ‘শঙ্করে’ই ।
আরও পড়ুনঃ লজ্জা! ফুটে উঠছে ‘উন্নয়নের বাংলার’ করুন ছবি; ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৮ লাখ বেকারের ভাতার আবেদন
বরানগরে যে ছাত্র নেতাকে ‘গালিগালাজ’ এবং ‘শাসানি’ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল বিধায়ক ‘ঘনিষ্ঠ’ এই তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে, তার একটি অডিয়ো সামনে এসেছিল ঘটনার পরপরই (যার সত্যতা যাচাই করেনি ইটিভি ভারত) । সেই অডিয়োয় নিজের পরিচয় দিয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ হওয়া নিয়ে টিএমসিপি নেতার উদ্দেশ্যে অনবরত ‘গালিগালাজ’ এবং ‘হুমকি’ দিতে শোনা যাচ্ছে আইএনটিটিইউসি নেতা শঙ্কর রাউতকে ।
শুধু তাই নয়, বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাঁর হাত-পা ভেঙে দিতেও তিনি দু’বার ভাববেন না বলে ‘শাসানি’ দিচ্ছেন । পালটা, ছাত্র-নেতা এর প্রতিবাদ করে জবাব দিতে থাকলে ‘হুমকি’ ও ‘গালিগালাজ’-এর মাত্রাও বাড়তে থাকে । সেই অডিয়ো সামনে আসার পরেও প্রশাসন কিংবা দলীয় স্তরে পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা, বরং দলেই এই শাসক নেতার পদোন্নতি হয়েছে । তাঁকে তৃণমূল নেতা থেকে একেবারে বরানগর শহর আইএনটিটিইউসি-র সভাপতির মতো গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ।
এতেই দু’য়ে দু’য়ে চার করতে শুরু করেছেন বিরোধী শিবির । এ নিয়ে কটাক্ষও করতে ছাড়ছেন না শাসক দলকে । বিরোধী গেরুয়া শিবিরের দাবি, শঙ্কর রাউতের মতো তোলাবাজ নেতারাই এখন তৃণমূলের ‘সম্পদ’ ! তাই, যা হওয়ার তাই হচ্ছে । এ নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই । পালটা শাসক শিবিরের আবার দাবি, সব কিছুর মধ্যে রাজনীতি খোঁজা বিরোধীদের স্বভাব । ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যেও রাজনীতির রং লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে । এটা ঠিক নয় । কেউ দোষ করে থাকলে প্রশাসন প্রশাসনের মতো ব্যবস্থা নেবে । তার মানে এই নয় যে সব ঘটনার মধ্যে তৃণমূলের নাম জড়িয়ে দিয়ে দোষারোপ করতে হবে ।আর এই দাবি,পালটা দাবি ঘিরে ভোটের আবহে সরগরম হতে শুরু করেছে উত্তর 24 পরগনার বরানগর ।
এদিকে স্থানীয়দের একাংশের দাবি, যদি আগেই সাহস করে দলের তরফে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হত তাহলে এই দিনটা আজকে দেখতে হত না ৷ অন্যদিকে, বরানগর পুর এলাকার আনাচে-কানাচে কান পাতলেই শোনা যায় দাপুটে তৃণমূল নেতা শঙ্কর রাউতের ‘কীর্তি’ ! তোলাবাজি, কাটমানি, বেআইনি নির্মাণে মদত দেওয়া ছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে এলাকা ‘ত্রস্ত’ করে রাখার অভিযোগ । এলাকাবাসীর দাবি, এ-সব আইএনটিটিইউসি নেতার কাছে জল-ভাত । ভূরি-ভূরি কুকীর্তি রয়েছে তাঁর নামে । কিন্তু, কেউ প্রতিবাদ করলেই রক্ষে ছিল না । নিজের ঘনিষ্ঠ ছেলেদের পাঠিয়ে তাঁকে ‘শায়েস্তা’ করতে দু’বার ভাবতেন না । ফলে, ইচ্ছে থাকলেও প্রতিবাদ সাহস করার সাহস ছিল না কারোরই ।
যদিও, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা কোনও অভিযোগই মানতে চাননি বিতর্কিত আইএনটিটিইউসি নেতা শঙ্কর রাউত । ঘটনার পরপরই সমস্ত দায় অস্বীকার করে তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিলেন তিনি । অপরদিকে, তৃণমূল নেতা শঙ্কর রাউতের একের পর এক ‘কীর্তি’ ঘিরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে । এ নিয়ে তরজাতেও জড়িয়েছে শাসক তৃণমূল এবং বিরোধী বিজেপি ।
আরও পরুনঃ বাংলায় কি উন্নয়ন হয়েছে! ছেলে গুয়াহাটি IIT-তে পড়ে, যুব সাথী ফর্ম তুললেন বাবা
বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য তাপস মিত্র বলেন, “উনি নিজের এলাকায় একজন তোলাবাজ হিসেবেই পরিচিত । তৃণমূলের এই কীর্তিমান নেতা ব্যবসায়ীকে হুমকি দেবেন, তোলা চাইবেন এটাই তো স্বাভাবিক । ওঁর যা কাজ,উনি সেটাই করেছেন । তৃণমূল নেতার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন ওঁর দলেরই এক ছাত্র নেতা । সেই কারণে তাঁকে দলের নেতার হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল । গালিগালাজও করা হয়েছিল ওই ছাত্র নেতাকে । কিন্তু, দলের তরফে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি । উলটে, শুনছি তাঁর নাকি পদোন্নতি হয়ে আইএনটিটিইউসি-র সভাপতি হয়েছেন । এটাই তো অবস্থা তৃণমূল দলের ।”
বিজেপি নেতা আরও বলেন, “শঙ্কর রাউতের মাথায় স্থানীয় বিধায়কের হাত রয়েছে । বিধায়ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণেই ওঁর টিকিও ছুঁতে পারবে না পুলিশ । প্রশাসন এবং দলীয় স্তরে কোনও শাস্তি না-হওয়ায় তৃণমূল নেতার বেপরোয়া মনোভাব আরও প্রকট হয়েছে । ছাব্বিশের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই সমস্ত তোলাবাজ, মস্তানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে । এটা আমরা আশ্বস্ত করছি বরানগরবাসীকে ।”
পালটা গেরুয়া শিবিরকে জবাব দিয়েছেন বরানগরের তারকা বিধায়ক সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় । তাঁর কথায়, “সব কিছুর মধ্যে রাজনীতি খোঁজা ঠিক নয় । কোনও ঘটনা ঘটলেই তার মধ্যেই তৃণমূল দলের নাম জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে । ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা যে ঘটনায় ঘটে থাকুক তার সঙ্গে তৃণমূলের কোনও সম্পর্ক নেই । যদি কেউ অন্যায় করে থাকে সেটা প্রশাসন দেখবে, ব্যবস্থা নেবে । আসলে বিজেপির কোনও কাজ নেই । সেই কারণে সমস্ত জায়গায় রাজনীতি খুঁজে বেড়ায় ।”
তৃণমূল বিধায়ক বলেন, “আমাদের মতো জনপ্রতিনিধিদের এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই । আমাদের এখন একটাই কাজ বিজেপির চক্রান্ত রুখে দিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাতে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ না-যায় । তাই, বিজেপিরও উচিত রাজনীতি না-করে নিজের এলাকায় গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো । তৃণমূলের নেতা,কর্মী-সমর্থক বাংলা জুড়েই রয়েছে । বিজেপির মতো আমাদের দূরবীন দিয়ে বুথে কর্মী খুঁজতে হয় না ।”
প্রসঙ্গত, বরানগরে তোলাবাজি-কাণ্ডে আক্রান্ত ব্যবসায়ী সুদীপ্ত ঘোষ আইএনটিটিইউসি নেতা-সহ তাঁর ঘনিষ্ঠ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন থানায় । অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরেও এখনও অধরা তৃণমূল নেতা শঙ্কর রাউত । তবে, ব্যবসায়ীর উপর হামলা ও মারধরের ঘটনায় ইতিমধ্যে পুলিশ ওই তৃণমূল নেতার ঘনিষ্ঠ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে ।
ব্যারাকপুর কমিশনারেটের এক পদস্থ কর্তা বলেন, “আগের ঘটনায় কোনও অভিযোগ হয়েছিল কি না, তা দেখতে হবে । না-দেখে বলা সম্ভব নয় । তবে, এক্ষেত্রে লিখিত অভিযোগ হতেই সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তিনজনকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়েছে । বাকিদেরও খোঁজ চলছে । তাদের গ্রেফতার করার পর জেরা করে শঙ্করের ভূমিকা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।”









