রাজনীতিতে যাত্রাকে মিছিলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে হবে না ৷ যাত্রা মিছিলের থেকে সব অর্থে বিশেষ এবং নিবিড় ৷ নেতারা যাত্রাকে ব্যবহার করেন প্রতীক হিসেবে ৷ সংগঠনের শক্তি আরও বাড়াতে এবং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিতে ৷ ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদেরই লোক…’- যে কোনও যাত্রার নেপথ্যে এই বিশেষ রাজনৈতিক বার্তাই দিতে চান নেতারা ৷
আরও পড়ুনঃ “আমি সেই মেয়ে”! এসআইআর আবহে মৃতদের পরিবার নিয়ে দিল্লি সফর করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা
সোশাল মিডিয়া আর টেলিভিশনের যুগে মাইলের পর মাইলের পায়ে হাঁটা অথবা জেলায় জেলায় নিয়মিত কর্মসূচি নেওয়া বুঝিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক দলটি নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে ৷ জনসভার বাইরে বেরিয়ে জনসংযোগের জন্য সংশ্লিষ্ট নেতা এবং রাজনৈতিক দলটি যে বিশেষভাবে আগ্রহী তা বোঝানোর এর থেকে ভালো আর কোনও উপায় নেই ৷
বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের আগে আবার শাসক ও বিরোধী শিবির শুরু করেছে যাত্রা ৷ দুটি কর্মসূচি যাত্রা হলেও এদের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল বেশি ৷ দুটি রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য আলাদা আলাদা ভোটার-গোষ্ঠী ৷ দু’জনের রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং বাস্তবতাওআলাদা আলাদা ৷ রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে শুরু করে বাধ্যবাধকতার মধ্যেও অমিল বেশি ৷
সময় এক বাস্তবতা আলাদা
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করেছেন ‘আবার জিতবে বাংলা’ যাত্রা ৷ বিজেপি করছে পরিবর্তন সংকল্প যাত্রা ৷ দুটো যাত্রাই জনসংযোগ করতে ৷ শুধু জনসংযোগ বললে হয়তো সবটা বলা হবে না ৷ এখন ভোটারদের অস্থির মনোভাব আগের থেকে অনেক বেশি ৷ মেরুকরণের প্রভাব চোখে পড়ার মতো ৷ তাছাড়া চিরাচরিত রাজনীতির প্রতি তাদের অসন্তোষও বেড়েছে অনেকটা ৷ 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে এই দুটি যাত্রার মধ্যে থাকা বৈরিতা,দুটি দলের নেতৃত্বের তফাতের পাশাপাশি ভিড় এককাট্টা করতে পারার ফারককেও ব্যাখ্যা করে ৷
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভাগ্য ভোটের দিন ঠিক হয় না ৷ ভোটের অনেক আগে থাকতেই রাজনৈতিক দলগুলির বলা ভালো ভোটে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের ভাগ্য ঠিক হয়ে যায় ৷ চায়ের আড্ডায়, পাড়ার ঠেকে, ক্লাবের আলোচনায় আর রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের বিশ্লেষণেই ঠিক হয়ে যায়, শেষ হাসি কে হাসবে ৷ রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং তাকে ঘিরে থাকা মানুষের আবেগের সঙ্গে রাজনৈতিক বার্তাকে কীভাবে সুকৌশলে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় তার উপরই নির্ভর করে জয়-পরাজয় ৷ সেই বিচারে অভিষেকের যাত্রাকে গ্যালারি শো বলা যাবে না ৷ বরং এটা অনেক বেশি রাজনৈতিক যাত্রা যা তৈরি করেছে এমন এক রাজনৈতিক দল যারা বাংলার ভোটারদের মন বুঝতে পারে, পড়তে পারে ৷
যাত্রার ক্ষমতা, ক্ষমতার যাত্রা
তৃণমূল এই সভার পরিকল্পনা করছে অনেকদিন আগে ৷ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন শুরুরও আগে ৷ লক্ষ্য কৃষক থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রী এবং দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলা, আলোচনা কর ৷ তৃণমূলের নেতারা যে শুধু বলতে নয়, শুনতেও ভালোবাসেন সেটা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে ভোটারদের ৷ জনসংযোগের এই প্রকার এখন গণ-রাজনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি ৷
আবার জিতবে বাংলা এক সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় ৷ স্লোগান থেকেই বোঝা যায়, ঠিক কেন এই যাত্রা শুরু করেছেন অভিষেক ৷ তৃণমূল আরও একবার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কি না সেই সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবং উদ্বেগ-মুক্ত হতেই যাত্রা শুরু করেছেন তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড ৷
যাত্রার মাধ্যমে তিনটি কাজ হতে পারে ৷ প্রথমত, একটি যাত্রা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মধ্যে নতুন উৎসাহের সঞ্চার করতে পারে ৷ বেশ কয়েক বছর ধরে লাগাতার সমালোচিত বা উপেক্ষিত হতে হতে কর্মীদের একাংশ নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেক সরিয়ে রাখতে পছন্দ করেন ৷ এই ধরনের যাত্রার সময় তাঁরা আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পান ৷ দ্বিতীয়ত, এই ধরনের রাজনৈতিক যাত্রার ফলে নেতারাও নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে সবিস্তারে জানতে পারেন ৷ কোনও একটি এলাকার বিধায়ক বা স্থানীয় নেতারা জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন কি না সেটা খুব ভালো করে বোঝা সম্ভব হয় ৷ টিকিট বন্টনের আগে এই তথ্যের দাম অনেক ৷ তৃতীয়ত, এই যাত্রা থেকে অভিষেক-সহ তৃণমূলের নেতাদের পক্ষে সকলের মধ্যে একটি বিশেষ বার্তা দেওয়াও সম্ভব হতে পারে ৷ তা হল- কেন্দ্রীয় সরকারের সক্রিয় সমর্থন না-পেলেও বাংলা নিজেই নিজের আগামী ঠিক করতে সক্ষম ৷
তবে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়ার দিক বদলে দেওয়ার ক্ষমতা কোনও যাত্রারই নেই ৷ 15 বছর সরকার চালানোর পর মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানো খুবই স্বাভাবিক বিষয় ৷ একটি যাত্রা করে সেই রাগের খানিকটা প্রশমন করা গেলেও ভুলিয়ে দেওয়া যায় না ৷ আবার তৃণমূলের দিক থেকে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়া বা পরিচয়ের রাজনীতির ভিত্তিতে তাদের ভোট ব্যাঙ্কে ভাগ বসানো থেকে নিরস্ত্র করাও অসম্ভব ৷
আরও পড়ুনঃ শিল্পোন্নয়নে কেন্দ্রের থেকে এক হাজার একর জমি কেনার সিদ্ধান্ত, প্রশ্নে মমতার ল্যান্ড ব্যাঙ্ক!
অভিষেকের যাত্রার গুরুত্ব
‘আবার জিতবে বাংলা’ যাত্রার মাধ্যমে অভিষেক বাংলার মানুষের কাছে নিজেকে পরিচিত করতে চাইছেন তা নয় ৷ যে রাজ্যে তাঁর দলের সরকার আছে, যেখানকার মানুষের চাহিদা অনেক বেশি তিনি সেই এলাকায় ফিরে যাচ্ছেন বারবার ৷ ক্ষমতায় থাকার এতদিন পর মানুষের হতাশাও অস্বাভাবিক নয় ৷ সেটা তাঁর জানা ৷ আর ঠিক সেই কারণে এই কর্মসূচিতে ঝুঁকির পরিমাণ বেশি হয়ে যায় ৷ কারণ ভোটারদের শুধু স্বপ্ন দেখালেই হবে না ৷ কী কী করা গিয়েছে আর কী কী করা যায়নি সেই প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে ৷ বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় দুর্নীতি নিয়ে মানুষের মনে যতটা ক্ষোভ আছে তার মোকাবিলা কী করে করা যায় সেটার উপর যাত্রার সাফল্য নির্ভর করছে অনেকাংশে ৷ বাংলার এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে গিয়ে অভিষেক জানান দিচ্ছেন, তৃণমূল যা যা করেছে তার জন্য তাদের ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা উচিত ৷
অভিষেকের এই যাত্রাকে ব্যবহার করে তৃণমূল তাদের সাংগঠনিক ত্রুটি মেরামত করার একটা বড় সুযোগ পাবে ৷ বুঝতে পারবে সংগঠনের ঠিক কোন কোন জায়গায় সমস্যা থেকে গিয়েছে ৷ তবে এটাও মনে রাখতে হবে সাধারণ মানুষ তৃণমূল বা তৃণমূলের নেতাদের নিয়ে যে মনোভাব ব্যক্ত করছেন তাকে গুরুত্ব না দিয়ে টিকিট বন্টন করলে এই যাত্রার তেমন কোনও গুরুত্ব থাকবে না ৷ জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন এমন নেতাকে গুরুত্ব দিলে বা ভোটে দাঁড় করালে জনমানসে বিরুপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে ৷ সেই বিবেচনা থেকে এই যাত্রা থেকে কী কী উঠে আসে তাকে বিশ্লেষণ করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করবেন, প্রচারে রূপরেখা ঠিক করবনে ৷ তার মানে নির্বাচন সংক্রান্ত সেই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মমতার দল খানিকটা বাড়তি সময় পেয়ে যাবে ৷ সমালোচনায় কান না-দিয়ে রাজনৈতিক মানচিত্রে নিজেদের দাপট আরও বাড়ানোর দিকে মন দিয়েছে তৃণমূল ৷ বাংলায় আসলে এটাই নির্বাচনে জয়ের দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে যাওয়া ৷
রাজনৈতিক বিবেচনাবোধ থেকে আমলা বা স্থানীয় এলাকায় দলের বড় নেতাদের কথায় ভরসা না রেখে সাংগঠনিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ অভিষেক নিয়েছেন ৷ আজ বলে নয়, দীর্ঘদিন ধরেই সাংগঠনিক বিষয়ে অভিষেক মমতার বিশ্বস্ত সেনাপতি ৷ তাঁর ভূমিকা দলের অন্দরে কখন প্রশংসা পেয়েছে ৷ আবার খানিকটা বিরূপ প্রতিক্রিয়াও অভিষেক পেয়েছেন দলীয় সতীর্থদের থেকে ৷ এবার এই যাত্রাকে হাতিয়ার করে দলে নিজের আধিপত্য আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছেন অভিষেক ৷ রাজনীতির ব্যকরণ মেনে এবং দরকারি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ৷ দলের সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের অভাব-অভিযোগ শুনে এবং সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়ে নিদর্শন তৈরি করছেন তিনি ৷ বারবার বুঝিয়ে দিতে চাইছেন, অবহেলা কোনওভাবে বরদাস্ত করা হবে না ৷
ক্ষমতা বনাম আশা–আকাঙ্খা
অভিষেকের রাজনৈতিক আকাঙ্খা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও এই যাত্রাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে ৷ নিজের হাতে তৈরি দলে মমতা এখনও অবিসংবাদিত নেত্রী ৷ তাঁর পর কে ? এ প্রশ্ন অনুচ্চারিত হলেও বহুল চর্চিত ৷ এটাই অভিষেকের কাছে সুযোগ ৷ তিনি নিজেকে শুধুই মমতার পরিবর্ত হিসেবে তুলে না-ধরে একজন জননেতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছেন ৷ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের বিরোধিতায় মুখর অভিষেক ৷ যাত্রা থেকে প্রায় প্রতিদিন নির্বাচন কমিশনকে বাক্য বাণে বিদ্ধ করছেন ৷ আবার অন্য রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে নিগ্রহের শিকার হওয়া অথবা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া বাংলায় কথা বলা শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়াবার বার্তা দিচ্ছেন ৷ বুঝতে সমস্যা হয় না তিনিই তৃণমূলের আগামী ৷









