spot_img
Thursday, 19 February, 2026
19 February
spot_img
Homeসমস্তPankaj Kumar Mullick: "পদপ্রান্তে রাখো সেবকে"; আজীবন রবীন্দ্রমগ্নতায় থেকেও বিশ্বভারতীর কোনো স্বীকৃতি...

Pankaj Kumar Mullick: “পদপ্রান্তে রাখো সেবকে”; আজীবন রবীন্দ্রমগ্নতায় থেকেও বিশ্বভারতীর কোনো স্বীকৃতি বা সম্মান তাঁর জোটেনি

আজীবন রবীন্দ্রমগ্নতায় থেকেও বিশ্বভারতীর কোনো স্বীকৃতি বা সম্মান তাঁর জোটেনি।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

সুদিন চট্টোপাধ্যায়

আজ সংগীত সাধক পঙ্কজকুমার মল্লিকের প্রয়াণবার্ষিকী।  আজই একথা স্মরণ করা সঙ্গত যে তিনি তাঁর পুরো জীবন রবীন্দ্রনাথের গানকে পুজোর কুসুমের মতো অবিচল নিষ্ঠায় বঙ্গবাসীর উদ্দেশ্যে নিবেদনে করে গেছেন। কলকাতার চালতাবাগানের এক বনেদি ধর্মপ্রাণ পরিবারে সকাল সন্ধের প্রার্থনা সংগীতের সুর ও শব্দ অন্তরে গেঁথে নিয়ে বড়ো হয়েছিলেন তিনি। স্কটিশচার্চে পড়াশোনা করতে করতে গান পাগল পঙ্কজকুমার উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম শুরু করেন কিন্তু তাঁর মন দখল করে ছিল রবীন্দ্রনাথের সুরের সুষমা আর কাব্যের কলতান।  কেবল কবির গান শোনার ব্যাকুলতায় প্রত্যেক শনিবার কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের ব্রাহ্ম মন্দিরের এক কোণায় সমাহিত স্তব্ধতায় বসে শুনে শুনেই মনে গেঁথে নিয়েছিলেন, ‘এই মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবে’, ‘আমি কান পেতে রই’, ‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে’, ‘পদপ্রান্তে রাখো সেবকে’র মতো অনেক গান। রবীন্দ্রনাথের গান, তাঁর আত্মায়, অণু পরমাণুতে মিশে গিয়েছিল। এসব গান তাঁর আলস্য আবেশের নয়, ছিল উন্নত উপলব্ধির মহার্ঘ সঞ্চয়, যা তাঁর গায়কিকে, পরবর্তীকালে শান্ত, উৎসর্গময়তা এনে দেয, যা কোনো গুরুশশিষ্য পরম্পরা থেকে প্রাপ্ত নয়, যা তাঁর নিভৃতচারী হৃদয়ের আপন উৎকন্ঠ অর্জন। শান্তিনিকেতনের আশীর্বাদ তাঁর মাথায় ছিল না, গুরুদেবের পদপ্রান্তে বসে  তিনি গান শেখেননি। কবির গান তিনি আপন আত্মা দিয়ে আয়ত্ত করেছেন। তাঁর শিক্ষক তিনি নিজেই। দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর পরিচয়, দেখাসাক্ষাৎ ছিল, কিন্তু তিনি পঙ্কজের সঙ্গীত গুরু ছিলেন না কোনোদিনই। রবীন্দ্র পরিমণ্ডলের কেউ নন পঙ্কজকুমার ।

আরও পড়ুনঃ চলতি সপ্তাহে বাতিল একের পর এক লোকাল ট্রেন

১৯২৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পঙ্কজ মল্লিক বেতারে প্রথম গান গাইলেন। রবীন্দ্রনাথের গান দিয়েই তাঁর বেতার জীবন শুরু, “এমন দিনে তারে বলা যায়”, আর “একদা তুমি প্রিয়ে আমারই এ তরুমূলে”।

১৯২৯ সালে তিনি “সঙ্গীত শিক্ষার আসর”-এর দায়িত্ব পেলেন। সব ধরনের গান শেখানোর কথা। কিন্তু এই আসরের মধ্যে দিয়েই অখণ্ড বাংলার, সমুদ্র, সমতল ও পাহাড়ের ঘরে ঘরে তিনি রবীন্দ্রনাথকে পৌঁছে দেওয়ার ব্রত শুরু করলেন। এ ছিল তাঁর নীরব সাধনা••• রবীন্দ্রনাথের গানকে তিনি  জীবনের  পরম প্রার্থিত ও বন্দিত করে তারই উদ্দ্যেশ্যে  প্রাণের  অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন।  রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বাঙালি গায়ক ও শ্রোতাদের মনের বৈঠকখানা  ডিঙিয়ে অন্ত:পুরে ঠাঁই করে দেবার জন্যে তাঁর প্রায় গোটা জীবনটাই  সমর্পিত হয়েছে।  আকাশবাণীর ‘সংগীত শিক্ষার আসর’-এর  ইতিহাস যদি  কোনোদিন লেখা হয় তো এ সত্য নিশ্চয় স্বীকৃতি  পাবে।

১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন’ ও ‘তোমার আসন শূন্য আজি’ তাঁর প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড।

পঙ্কজ কুমার মল্লিক ‘দিনের শেষে.. ‘ গানটি  গেয়ে অনেক খ্যাতি অখ্যাতি  কুড়িয়েছেন, আলোচনা-বিতর্কেও জড়িয়েছেন। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করতে পারবো না যে গানটি শুনলে আজও রোমাঞ্চ হয়, ম্রিয়মাণ দিনাবসানের সমাপ্তপ্রায় আলোয়  মন বেদনায় ছেয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথের ‘ দিনের  শেষে ঘুমের দেশে ‘, কবিতাটি ‘খেয়া ‘ কাব্যগ্রন্থের ‘ শেষ খেয়া ‘ নামে অন্তর্ভূক্ত হয়ে ১৯০৬ সালে প্রকাশিত  হয়। পঙ্কজ কুমার মল্লিক , প্রমথেশ বড়ুয়ার  একটি ছায়াছবিতে  সুরকার এবং গায়ক হিসেবে  নির্বাচিত হলে  এই কবিতাটি নিজের  দেওয়া সুরে গাইতে চান , কারণ তখনও পর্যন্ত কবি বা তাঁর  অনুমোদিত  কেউ কবিতাটিতে সুর দেননি।

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের মধ্যস্থতায় তাঁর বরানগরের  বাড়ি ‘ আম্রপালী ‘তে কবির সঙ্গে  পঙ্কজ মল্লিকের সাক্ষাৎ হয়। কবি চিত্রনাট্যটি আগাগোড়া শুনে ছবির নামকরণ করে দেন ‘মুক্তি’ এবং পঙ্কজ  মল্লিকের গলায়, তারই সুরে ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে ‘ গানটি শুনে প্রসন্ন হয়েই সেটি রেকর্ড করার অনুমতি দেন।

গানের কথায় রবীন্দ্রনাথ সামান্য একটু পরিবর্তনের পরামর্শও দেন। ‘চোখের জল ফেলতে হাসি পায়’-এর বদলে ‘অশ্রু যাহার ফেলতে হাসি পায়’ করা হয়।

পঙ্কজবাবুর গলায় গাওয়া গানটি নিয়ে ১৯৩৭ সালে ছবিটি মুক্তি  পায়।  পরে অবশ্য  গানটি রেকর্ড করে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়  খুবই  বাহবা পেয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ নিউইয়র্ক গভর্নর পদে হকুলের রানিং মেট অ্যাড্রিয়েন অ্যাডামস

পঙ্কজকুমার এই গানটির সঙ্গে সঙ্গে ‘আমি কান পেতে রই’ ও ‘তার বিদায়বেলার মালাখানি’ গানদুটিও চলচ্চিত্রে ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে আসেন। ছবিতে গানদুটি যথাক্রমে পঙ্কজকুমার মল্লিক ও কানন দেবী গেয়েছিলেন।

পঙ্কজকুমার মল্লিক ‘পদ্মশ্রী’, ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু আজীবন রবীন্দ্রমগ্নতায় থেকেও বিশ্বভারতীর কোনো স্বীকৃতি বা সম্মান তাঁর জোটেনি। এমনকি কবির সুরারোপিত নয় বলে ‘বিশ্বভারতী ‘ কর্তৃপক্ষ গানগুলিকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মর্যাদা পর্যন্ত দেয়নি এবং ‘গীতবিতান ‘-এর অন্তর্ভূক্ত করেনি।  ‘গীতবিতান’-এর পরিশিষ্টে  ছাপা হয়েছে, “এই গানগুলি সময়বিশেষে প্রচলিত বা আদৃত হইলেও, এগুলিতে কোনোটিতেই কবি সুর না দেওয়াতে, এগুলিকে রবীন্দ্রসংগীত বলিয়া গণনা করা সম্ভবপর হয় নাই।” এই পুরস্কারটুকু নিয়েই পঙ্কজকুমার মল্লিক রবীন্দ্র পদপ্রান্তে সেবক হয়েই থেকে গেছেন চিরকাল।

কিন্তু পঙ্কজকুমার প্রশস্তি ও পুরস্কার পেয়েছেন আমার মতো আজীবন রবীন্দ্রগান পাগল মানুষের কাছ থেকে। বাইশ বছরে যেমন, আজও ঠিক তেমনই , পঙ্কজ মল্লিকের রবীন্দ্র গান আমাকে বিহ্বল করে, শান্ত করে, বিরলে সঙ্গী হয়, সাহসী করে, প্রেমে অপ্রেমে প্লাবিত করে। রবীন্দ্রনাথের গান আমাকে উন্নত ও উদাত্ত করেছে। আমার উপাসনায়, ব্যথার উপশমে, তিনিই  আমার অবলম্বন, আমার আশ্রয় ও আনন্দ। আর সেই গন্তব্যে যাঁরা পৌঁছে দেন, পঙ্কজ মল্লিক তাঁদেরই একজন। তাঁর গাওয়া গান আমি তাই বারেবারে শুনেছি, আজও শুনছি,  আমৃত্যু শুনবো।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন