ধূলিকণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটার নয়, বরং শহরের বাতাসের গুণমাণ নষ্ট করার নেপথ্যে খলনায়ক বিষাক্ত গ্যাস। নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (NO₂) এবং গ্রাউন্ড-লেভেল ওজোন (O₃)-এর মতো ক্ষতিকারক গ্যাসগুলি কলকাতার বাতাসকে পরিবেশবিদদের মতে, কলকাতার দূষণ কখনোই মানতে চাননি পুরসভার কর্তারা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কার্যত মেয়র বাধ্য হলেন কলকাতা পুরসভায় পরিবেশ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকতে।
আরও পড়ুনঃ অনশনে বিধায়ক শংকর ঘোষ; আগামিকাল সকাল ৮টায় প্রত্যাহার অনশন
গত কয়েকদিন ধরে শহরের বায়ুদূষণের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়েছে। বায়ু দূষণের সূচক অনুযায়ী, বাতাসের দূষণের মাত্রা ক্রমশ খারাপ হয়েছে। বুধবার রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড, কলকাতা পুরসভা, কলকাতা পুলিশ, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সম্প্রতি ‘রেস্পাইরার লিভিং সায়েন্সেস’-এর একটি সমীক্ষায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে । তাদের ‘অ্যাটলাস একিউ’ (Atlas AQ) প্ল্যাটফর্মের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, ২০২৫ সালে মোট ৮২ দিন এমন ছিল, যখন বাতাসের গুণমান সূচক বা একিউআই (AQI) নিয়ন্ত্রিত হয়েছে মূলত বিষাক্ত গ্যাসের দ্বারা। অর্থাৎ, পার্টিকুলেট ম্য়াটার বা ধূলিকণার থেকেও এই দিনগুলিতে বাতাসে গ্যাসের প্রকোপ ছিল বেশি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, কলকাতার দূষণ এখন আর একমুখী নয়, বরং তা ‘মাল্টি-পলিউট্যান্ট’ বা বহু উপাদান-নির্ভর হয়ে উঠছে। সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই ৮২ দিন ধূলিকণা প্রধান দূষক ছিল না, তার মধ্যে ৬৮ দিনই বাতাসে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের আধিপত্য ছিল। ১২ দিন দাপট দেখিয়েছে গ্রাউন্ড-লেভেল ওজোন এবং ২ দিন কার্বন মনোক্সাইড। তবে বছরের বাকি দিনগুলিতে অবশ্য ধূলিকণাই ছিল প্রধান। ১৬৬ দিন পিএম ১০ (PM10) এবং ১১৭ দিন পিএম ২.৫ (PM2.5) ছিল দূষণের মূল কারণ ৷ কিন্তু গ্যাসের এই ক্রমবর্ধমান দাপট নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে পরিবেশবিদদের কপালে।বিষিয়ে তুলছে। শহরের বায়ুদূষণের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ জায়গায় পৌঁছেছে। বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন মেয়র ফিরহাদ হাকিমও। তিনি বলেছেন, দিল্লি এবং কলকাতার কারণে দূষণ বাড়ছে। দু’টি শহরের কাছে কোনও সমুদ্র নেই। ফলে যে দূষণ তৈরি হচ্ছে, তা বসে যাচ্ছে। দক্ষিণা বাতাস না থাকায় সেই দূষণ শহর থেকে বেরিয়ে যেতে পারছে না। ফলে বায়ু দূষণের মাত্রা এই জায়গায় পৌঁছেছে।
রেস্পাইরার লিভিং সায়েন্সেস-এর সিইও রৌনক সুতারিয়া বলেন, “আমরা প্রায়শই বাতাসের গুণমান বা একিউআই বলতে শুধুই ধূলিকণা-জনিত দূষণকে বুঝি । কিন্তু তথ্য বলছে পরিস্থিতি আরও জটিল। শহরবাসীরা এমন সব স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন, যা শুধুমাত্র ধূলিকণার হিসেব দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।” তিনি সতর্ক করে জানান, শহরগুলি যদি দূষণকে শুধুমাত্র ধূলিকণার সমস্যা হিসেবে দেখে, তবে জনস্বাস্থ্যের উপর যে বড় বিপদ ঘনিয়ে আসছে, তার একটা বড় অংশ অদেখা থেকে যাবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড বাড়লে শ্বাসনালীতে প্রদাহ, হাঁপানির টান বাড়া এবং বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে, গ্রাউন্ড-লেভেল ওজোন ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
আরও পড়ুনঃ গ্রেফতার বৃদ্ধা ইন্দু দাস! পুরনো মামলার নতুন মোড়
বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অধ্যাপক অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “এবছর তাপমাত্রা কম থাকায় মানুষ উষ্ণতার জন্য প্রচুর পরিমাণে বর্জ্য, প্লাস্টিক এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পুড়িয়েছেন। এর ফলে কার্বন মনোক্সাইড এবং ক্যানসার সৃষ্টিকারী পলিনিউক্লিয়ার অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন বাতাসে মিশছে, যা গুরুতর শ্বাসকষ্টের কারণ।” তিনি আরও জানান, এই দূষকগুলি একে অপরের সঙ্গে মিশে ‘পারোক্সিয়াসিটাইল নাইট্রেট’ (PAN) তৈরি করে, যা এবছর শীতের সকালে দেখা দেওয়া ধোঁয়াশার অন্যতম কারণ ৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ধূলিকণা কমানোর চেষ্টা করলেই হবে না, বিষাক্ত গ্যাস নিয়ন্ত্রণেও অবিলম্বে বহুমুখী কৌশল বা ‘মাল্টি-পলিউট্যান্ট স্ট্র্যাটেজি’ নেওয়া প্রয়োজন ৷ পাশাপাশি বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করতে কড়া নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
শহরের ডানলপ, উল্টোডাঙা, মৌলালি, রবীন্দ্র সরোবর এবং হাওড়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকাগুলিকে ‘হটস্পট‘ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আবহাওয়ার কারণে শহরের দূষণ বাড়ছে, তেমনটা নয়। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণ কাজের ধুলো এবং স্থানীয় কলকারখানার ধোঁয়া কলকাতার দূষণের মূল কারণ। যার জেরে তাপমাত্রা বাড়লেও দূষিত বাতাস মাটি থেকে উপরে উঠতে পারছে না। এর ফলে সাধারণ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের এই সময়ে বাড়ির বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কলকাতা পুলিশকে মেয়র নির্দেশ দিয়েছেন, দূষণ যাচাই সংক্রান্ত সার্টিফিকেট যে গাড়িগুলিতে নেই, সেগুলি নিয়ে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে। গাড়িগুলিকে ভালভাবে পরীক্ষা করতে হবে। দীর্ঘক্ষণ গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকায়, এখানে যেভাবে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, তাতে দূষণ তৈরি হচ্ছে। দ্রুত গাড়িগুলিকে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করাতে হবে। যানজট মুক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে কলকাতা পৌরসভার আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, রাস্তায় বালি যাতে না পড়ে থাকে। পাশাপাশি, রাস্তায় যত্রতত্র নির্মাণ সামগ্রী পড়ে থাকছে। যেখান থেকে ধুলো উড়ে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে বলে মত পরিবেশবিদদের। একইসঙ্গে নির্মীয়মান আবাসন বা নির্মাণের কাজ চললে সেগুলোকে বাইরে দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। কাপড় দিয়ে বা নির্দিষ্ট আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে না রাখলে, কাজ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মেয়রের তরফে। অপরদিকে, রেল বিকাশ নিগম লিমিটেডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, শহর জুড়ে একাধিক জায়গায় মেট্রোর কাজ চলছে। বেশ কিছু জায়গায় খোঁড়ার কাজ হয়েছে। লাইন বসানো হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে হচ্ছে না। ঠিকমতো ঢেকে না রাখার জেরে, সেই জায়গাগুলি থেকে ধুলো উড়ে পরিবেশ দূষণ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে শহরে স্প্রিংকলার এবং ফগ ওয়াটার মেশিন ব্যবহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শহর জুড়ে জল স্প্রে করে দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে মেয়র জানিয়েছেন। প্রয়োজনে শহরে আনাচে-কানাচে জলের ট্যাঙ্ক রাখা হবে। সেখান থেকে জল সরবরাহ করে স্প্রে করা হবে।









