প্রশাসনিক জটিলতা ও বকেয়া অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ও দূরশিক্ষা বিভাগের স্নাতক–স্নাতকোত্তরের ১৩টি সিমেস্টারের প্রায় ছয় হাজার পড়ুয়ার পরীক্ষা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তিন কোটি টাকার বেশি পাওনা না মেটানোয় পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
৬ জানুয়ারি থেকে স্নাতকোত্তরের প্রথম ও তৃতীয় সিমেস্টারের পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও তা আপাতত স্থগিত। এর আগেই তৃতীয় ও চতুর্থ সিমেস্টারের সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। আইন বিভাগের স্নাতক স্তরের পাঁচটি এবং দূরশিক্ষার চারটি সিমেস্টারের পরীক্ষাও আটকে রয়েছে। শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের ডাকা বৈঠকেও কোনও সমাধান মেলেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চলছে। তবে আধিকারিক ও শিক্ষকদের মতে, সংস্থা রাজি হলেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বাকি থাকায় অন্তত মাস দেড়েকের আগে পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব নয়। পরীক্ষা পিছোলে ফলপ্রকাশে বিলম্ব হবে, যার ফলে ভর্তি ও চাকরির পরীক্ষায় সমস্যায় পড়বেন পড়ুয়ারা। উপাচার্যহীন অবস্থায় এই সংকট কবে কাটবে, তা নিয়েই প্রশ্ন।
আরও পড়ুনঃ ‘বেনজির’ প্রত্যাবর্তন! ঘাসফুল ছেড়ে হঠাৎ কংগ্রেসের হাত ধরলেন মৌসম; বড় অস্বস্তি তৃণমূলের
PSU রাজ্যে যুগ্ম সহ সমপাদক তথা আলিপুরদুয়ার জেলা সম্পাদক যিনি জলপাইগুড়ি ল কলেজের পড়ুয়া তিনি জানান সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ছয় হাজার পরীক্ষার্থী বর্তমানে পরীক্ষাসূচি ও ফলপ্রকাশ সংক্রান্ত চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। প্রশ্নপত্র প্রস্তুতির অসম্পূর্ণতা, খাতা ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, একাধিক সেমিস্টারের ফল দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত থাকা—এই তথ্যগুলি কোনও গুজব নয়; এগুলি সংবাদমাধ্যমে লিখিতভাবে নথিভুক্ত বাস্তবতা।
এই প্রেক্ষিতে পরীক্ষার সূচি নিয়ে যে ধারাবাহিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে, তা নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি নয়—এটি পরিকল্পনাহীনতা, চরম অদক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর দায়িত্বহীনতার নগ্ন প্রতিফলন। যে প্রশাসন পরীক্ষা পরিচালনার নামে হাজার হাজার পড়ুয়াকে অনিশ্চয়তার অতলে ঠেলে দেয়, যে প্রশাসন সময়মতো প্রশ্নপত্র, ফর্ম ফিল-আপ কিংবা ফলপ্রকাশ—কোনোটিই নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, তারা আজ ‘সময় চাই’ বলে দায় এড়ানোর নৈতিক দেউলিয়াপনার ভাষ্যই কেবল তুলে ধরছে। এ কেমন প্রশাসনিক ব্যর্থতা? এই অনিয়মের মূল উৎস কোথায়?
পরীক্ষা কোনও দয়া বা অনুগ্রহ নয়—এটি ছাত্রছাত্রীদের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে আজ প্রযুক্তিগত অজুহাত, কর্মীর অভাব কিংবা ব্যবস্থাপনার ঘাটতির আড়ালে নিজেদের অপদার্থতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রশ্নটা খুবই সরল—যদি প্রস্তুতি ছিল, তবে বারবার পরীক্ষার সূচি পরিবর্তন করা হলো কেন? যদি প্রশাসনিক সক্ষমতা থাকত, তবে কেন হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে ‘পরবর্তীতে ভাবা হবে’—এই অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা হলো?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজার পরিবর্তে কর্তৃপক্ষ বারবার বলছে—‘বিভাগ চাইলে আলাদা ব্যবস্থা করতে পারে’। প্রশাসন যখন নিজের দায় বিভাগগুলির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়, তখন সেটি প্রশাসন থাকে না—তা পরিণত হয় এক ধরনের দায়হীন মধ্যস্বত্বভোগীতে।
কখনো বার কাউন্সিলের ন্যায্য পাওনা দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা, আবার কখনো পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর প্রাপ্য অর্থ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ না করে প্রশাসনিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চরম নজির স্থাপন করা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ আড়াইশো টাকায় কী হয়? চতুর্থবার ক্ষমতায় এলেই চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি: অভিষেক
পূর্বেও সরস্বতী পূজার পরদিন পরীক্ষা নির্ধারণের মতো অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল? পরে বাধ্য হয়ে সেই সিদ্ধান্ত সংশোধন করা, এবং সর্বশেষ নির্ধারিত পরীক্ষার তারিখ পুনরায় পিছিয়ে দেওয়া—এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে এই ব্যর্থতা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অব্যবস্থার ধারাবাহিকতা। সরস্বতী পূজা ও শবেবরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের সময় একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে সংশোধন করতে হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই অনিয়মের দায় কার?
উৎসব কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়; এগুলি আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পূর্বঘোষিত পরীক্ষাসূচির উপর ভরসা করেই বহু শিক্ষার্থী নিজেদের যাতায়াত ও পারিবারিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিল। একতরফাভাবে সূচি পরিবর্তনের ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা চরম সমস্যার মুখে পড়েছে এবং বহু ছাত্রছাত্রী ধর্মীয় ও পারিবারিক উৎসব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই অন্যায়ের দায়ভার কি কখনও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বীকার করেছে?
পরীক্ষার ফি আদায়ের সময় কোনও অনিয়ম হয় না, লেট ফাইনের ক্ষেত্রে এক পয়সাও ছাড় দেওয়া হয় না—তবে পরীক্ষার সূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এত চরম অব্যবস্থা কেন? শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি, সময়নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক ও মানসিক স্থিতিশীলতার কোনও মূল্য কি প্রশাসনের কাছে নেই?
আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই—এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের ধৈর্যকে দুর্বলতা ভাবার দিন শেষ। অনির্দিষ্ট সময়, অস্পষ্ট আশ্বাস এবং প্রশাসনিক গাফিলতির বিরুদ্ধে সংগঠিত ও সচেতন প্রতিবাদ গড়ে উঠবেই। অবিলম্বে স্বচ্ছ, লিখিত ও বাধ্যতামূলক সময়সীমাসহ পরীক্ষা ও ফলপ্রকাশের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে এই চরম ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ করে প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় চলবে পড়ুয়াদের উপর ভর করেই—কর্তৃপক্ষের অজুহাতের উপর নয়। সময় থাকতে সংশোধনের পথে হাঁটুন। নচেৎ ইতিহাস সাক্ষী থাকবে—এই প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ নীরব থাকেনি।
শেষ প্রশ্ন থেকেই যায়—বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি এখনও বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার অন্ধকার যুগেই আটকে আছে? দায়িত্ববোধ কি শুধুই অলঙ্কারিক শব্দ, নাকি তা বাস্তবায়নের সামর্থ্য সত্যিই প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের আছে? যদি থাকে, তবে তার প্রতিফলন কোথায়?









