শুভজিৎ মিত্র,কলকাতা:
কথায় আছে,”বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ।”কিন্তু সেই পার্বণের তালিকায় এখন বিশ্বায়নের প্রলেপ। এক সময় বাঙালির শীতকাল মানেই ছিল লেপ-কাঁথা আর নলেন গুড়ের গন্ধে ম ম করা পাড়ার মোড়, আর ছুটির দিনে দলবেঁধে চড়ুইভাতি বা পিকনিক। আজ সেই চেনা ছবিটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। খোলা আকাশের নিচে বনভোজনের আনন্দ আজ বন্দি হচ্ছে নাইট ক্লাবের চার দেওয়ালে, আর যৌথ পরিবারের অটুট বাঁধন আলগা হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধুনিকতায়।বদলে যাওয়া বাঙালির এই জাতিগত সত্ত্বার বিবর্তন বলা ভালো অপমৃত্যু আজ সমাজচিন্তকদের ভাবিয়ে তুলছে।সেই দুশ্চিন্তাকে সঙ্গী করে এই বিশেষ প্রতিবেদনের মাধ্যমে ক্ষয়িষ্ণু বাঙালী সাংস্কৃতির কথা তুলে ধরল বঙ্গবার্তা।
আরও পড়ুনঃ ধাক্কাধাক্কি-মারপিট, উৎসব পরিণত হল উৎ-শবে! পানিহাটি উৎসবে মৃত্যু এক যুবকের
বিনোদনের অভিমুখ বদল:পিকনিক বনাম নাইট ক্লাববিনোদনের অভিমুখ বদল:পিকনিক বনাম নাইট ক্লাব
বাঙালির শীতকালীন বিনোদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল পিকনিক। সস্তায় চাদর বিছিয়ে মাটিতে বসে খাওয়ার সেই তৃপ্তি, ব্যাডমিন্টন খেলা।আর এখন,শুধুমাত্র কিছু পিকনিক স্পট ভাড়া করে,ক্যাটারিং সার্ভিসের খাবার অর্ডার করে এবং উদ্দাম নাচ ও উচ্চৈঃস্বরে মাইক বাজিয়ে গান— এর মধ্যে ছিল এক গভীর সামাজিক সংযোগ রক্ষার ধুম বা।সেখানে পাড়ার রিকশাচালক থেকে শুরু করে অধ্যাপক,সবাই মিলেমিশে এক হয়ে যেতেন।
বর্তমানে সেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। বিশেষ করে বড়দিন বা বর্ষবরণের রাতে শহর থেকে শহরতলির তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘হ্যাংআউট’ মানেইশঙত্কান!আলোকোজ্জ্বল নাইট ক্লাব।এর পেছনে অবশ্য রয়েছে,পশ্চিমি প্রভাব।ডিজে-র কান ফাটানো শব্দ, কৃত্রিম আলো আর দামি পানীয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকাটাকেই এখন ‘স্মার্টনেস’ বলে গণ্য করা হচ্ছে।্কান!আলোকোজ্জ্বল নাইট ক্লাব।এর পেছনে অবশ্য রয়েছে,পশ্চিমি প্রভাব।ডিজে-র কান ফাটানো শব্দ, কৃত্রিম আলো আর দামি পানীয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকাটাকেই এখন ‘স্মার্টনেস’ বলে গণ্য করা হচ্ছে।
এখন সামাজিক দূরত্বটাই হলো বিনোদন।পিকনিকে যেখানে ‘আমরা’ ভাবটি প্রধান ছিল,সেখানেই এখন নাইট ক্লাবের ভিড়ে সেখানে মানুষ কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত।এটি বাঙালির সেই চিরন্তন সামুদায়িক বোধ বা ‘কমিউনিটি লিভিং’-এর মূলে কুঠারাঘাত করছে।
একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন ও ঐতিহ্যের অপমৃত্যু
বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদ ছিল তার যৌথ পরিবার। দাদু-ঠাকুমার রূপকথা, কাকা-পিসির শাসন আর ভাই-বোনেদের সাথে ভাগ করে নেওয়া শৈশব বাঙালির চরিত্র গঠনে বড় ভূমিকা নিত। কিন্তু নগরায়ন এবং চাকুরিজীবী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে শুরু হলো ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’ বা অণু পরিবারের যুগ।এর সাথে সমাজে মাথা চারা দিচ্ছে,মূল্যবোধের ক্ষয়।
তার কারণেই,যৌথ পরিবারে শিশুরা সহনশীলতা এবং ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা শিখত।এখনকার একক পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।
শুধু কি তাই? পাশাপাশি,অভিভাবকত্বের শূন্যতা আজকের যুগে প্রবল হয়ে উঠেছে।বাবা-মা দুজনেই কর্মব্যস্ত হওয়ায় শিশুরা শৈশব কাটাচ্ছে,আয়া অথবা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে।ফলে বাঙালির যে পারিবারিক মূল্যবোধ,তা আজ ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
এতে যে শিশুদের শৈশব বিপন্ন তাই নয়,একান্নবর্তী পরিবার ভাঙার সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছেন প্রবীণরাও।বাড়ির এক কোণে বা বৃদ্ধাশ্রমে তাঁদের দিন কাটছে, যার ফলে বাঙালির দীর্ঘদিনের ‘পারিবারিক ঐতিহ্য’ ও ‘শিষ্টাচার’ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।
আরও পড়ুনঃ সময় এগিয়ে আসছে, ডেডলাইন ২০৩২; ‘মৃত্যু’ এগিয়ে আসছে চাঁদের; জানিয়ে দিল নাসা
জাতিগত সত্ত্বার সংকট:বাঙালি কি তবে আত্মবিস্মৃত?
ভাষা এবং সংস্কৃতিই একটি জাতির পরিচয়। কিন্তু বর্তমানে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে পোশাক এবং চলন-বলনে এক ধরণের ‘হাইব্রিড’ সংস্কৃতি প্রকট হয়ে উঠছে।
এর ফলে,একদিকে বাঙালীর খাদ্যাভ্যাসেও বদল দেখা যাচ্ছে,ইদানিং বাঙালির শীতের পিঠে-পুলির জায়গা নিচ্ছে পিৎজা-বার্গার।
এখন বাংলার ভাষার বিকৃতি ঘটেছে,তার কারণেই বাঙালীর ঘরের আলোচনায় বাংলা ভাষার চেয়ে ইংরেজি বা হিন্দি শব্দের আধিক্য বাড়ছে।
এখন আনন্দপ্রিয় বঙ্গীয় সমাজে উৎসবের কৃত্রিমতার ছড়াছড়ি।বাঙালির নিজস্ব উৎসবের চেয়ে এখন ধার করা উৎসবে মাতামাতি অনেক বেশি। এই প্রবণতা বাঙালির স্বকীয়তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
বাস্তব প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ-এর আশঙ্কা!
সমাজতাত্ত্বিকদের মতে,আধুনিক হওয়া মানে নিজের শেকড়কে অস্বীকার করা নয়।কিন্তু,বর্তমান বাঙালি সমাজ আধুনিকতার সংজ্ঞা খুঁজছে পশ্চিমী অনুকরণে।যৌথ পরিবারের সেই নিরাপত্তা আর পিকনিকের সেই অকৃত্রিম আনন্দ যখন হারিয়ে যায়,তখনই বঙ্গীয় সমাজের বুনন আলগা হতে বাধ্য।
বহু বিশেষজ্ঞদের মতে,”যে জাতি তার ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে বর্তমানের সাথে মেলাতে পারে না, সেই জাতির ভবিষ্যৎ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।”
বাঙালির এই বিবর্তন কি কেবল সময়ের দাবি,নাকি নিজের অস্তিত্ব ভুলে যাওয়ার এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া— সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি সচেতন বাঙালির মনে। নাইট ক্লাবের উজ্জ্বল আলোয় আমরা যেন আমাদের হৃদয়ের সেই সহজ-সরল ‘বাঙালিয়ানা’কে হারিয়ে না ফেলি।
বাঙালি সংস্কৃতি আজ এক দোরাস্তায় দাঁড়িয়ে।একদিকে প্রযুক্তির হাতছানি আর বিশ্বায়ন,অন্যদিকে শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্য।আমাদের মনে রাখতে হবে,নাইট ক্লাবের নাচ বা অণু পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্য সাময়িক তৃপ্তি দিলেও,বাঙালির প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে ছিল তার একতা এবং সহজ জীবনযাপনে।যদি আমরা এখনই সজাগ না হই,তবে অদূর ভবিষ্যতে ‘বাঙালি জাতি’ কেবল ইতিহাসের পাতায় বা পাঠ্যবইয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে।









