অসীম কুমার সরকারঃ
মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে প্রাথমিক প্রয়োজনের একটি স্বীকৃত ক্রম আছে—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান। এই তিনটি ছাড়া মানুষের অস্তিত্বই বিপন্ন। এর পর ধাপে ধাপে আসে শিক্ষা, রুজি-রোজগারের সংস্থান, স্বাস্থ্যরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা। এই সবকিছু মিলেই একটি সুস্থ, স্থিতিশীল মানবজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। ধর্ম ঐতিহাসিকভাবে এই ভিত্তির উপরে অবস্থান করেছে—মানুষের মানসিক আশ্রয়, নৈতিকতা ও আত্মিক প্রশ্নের উত্তর হিসেবে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই স্বাভাবিক ক্রমটি ভেঙে পড়েছে।
ইদানীং দেখা যাচ্ছে, ধর্মকে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানেরও আগে এনে বসানো হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রচারের নিরবচ্ছিন্ন চাপে ধর্ম আজ মানুষের জীবনে প্রথম সারিতে চলে এসেছে। প্রশ্ন ওঠে—এই অগ্রাধিকার কি স্বাভাবিক? না কি এটি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা?
আরও পড়ুনঃ ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলতে নারাজ মুফতি কন্যা
যে দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনও অপুষ্টিতে ভোগে, যেখানে বেকারত্ব বাড়ছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংকটে, শিক্ষার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে—সেই দেশেই ধর্ম নিয়ে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা, বিভাজন ও উন্মাদনা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক সংকটগুলোর সমাধান নিয়ে যতটা না আলোচনা হয়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি আলোচনা হয় কে কোন ধর্ম পালন করবে, কার পোশাক কেমন হবে, কার খাদ্যাভ্যাস ঠিক কি না, কোন উৎসব “দেশপ্রেমিক” আর কোনটা “বিপজ্জনক”।
এই পরিবর্তন হঠাৎ ঘটেনি। এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলের ফল। ধর্ম মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—ভয়, আশা, পরকাল, পাপ-পুণ্য, পরিচয়ের বোধ। এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে প্রশ্নহীন অনুসারীতে পরিণত করা তুলনামূলকভাবে সহজ। ক্ষুধার প্রশ্নে মানুষ প্রতিবাদ করে, কাজের প্রশ্নে জবাব চায়, শিক্ষার প্রশ্নে হিসেব মেলে। কিন্তু ধর্মের প্রশ্নে মানুষ প্রায়ই যুক্তি ছেড়ে আবেগে ভাসে।
এখানেই “ধর্ম আফিম” কথাটির তাৎপর্য। আফিম যেমন ব্যথা ভুলিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেয়, তেমনি ধর্মের অপব্যবহার মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল করে দেয়। বেকার যুবককে বলা হয়—“ধৈর্য ধরো, ধর্ম বিপন্ন।” কৃষককে বলা হয়—“ফসলের দাম নয়, আগে সংস্কৃতি বাঁচাও।” শ্রমিককে বলা হয়—“মজুরি নয়, আগে ধর্মীয় গর্ব।” এভাবে ক্ষুধার জায়গায় গর্ব, বঞ্চনার জায়গায় পরিচয়, প্রশ্নের জায়গায় বিশ্বাস বসিয়ে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক দলগুলো এই নেশা ধরিয়ে দেওয়ার কাজটিই সুচারুভাবে করছে। ধর্মের নামে দেশকে ভাগ করার পরিকল্পনা চলছে—ভাষায়, পোশাকে, খাদ্যে, উৎসবে, ইতিহাসে। একদিকে মানুষ দিন দিন গরিব হচ্ছে, অন্যদিকে তাকে বোঝানো হচ্ছে সে “বিপন্ন সংখ্যাগরিষ্ঠ” বা “অবহেলিত পরিচয়”-এর অংশ। এই বিভাজনের রাজনীতিতে লাভবান হয় ক্ষমতাবানরা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।
আরও পড়ুনঃ ঠিক হয়ে গেল দিনক্ষণ, শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দিরের শিলান্যাস করবেন মমতা
ধর্ম নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন ধর্ম রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে, যখন ধর্ম প্রশ্নহীন আনুগত্য দাবি করে, যখন ধর্ম মানুষের নাগরিক অধিকারকে ছাপিয়ে যায়। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস হওয়ার কথা, রাষ্ট্রের হাতিয়ার নয়। কিন্তু আজ ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে শাসনের অস্ত্র হিসেবে—ভোটের অঙ্ক মেলাতে, ব্যর্থতা ঢাকতে, বিরোধী কণ্ঠ রোধ করতে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এই প্রক্রিয়ায় মানুষ ধীরে ধীরে তার প্রকৃত সমস্যাগুলোকেই ভুলে যাচ্ছে। অন্নের প্রশ্ন চাপা পড়ছে ধর্মের শ্লোগানে। বস্ত্র ও বাসস্থানের প্রশ্ন হারিয়ে যাচ্ছে পরিচয়ের লড়াইয়ে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিণত হচ্ছে গৌণ ইস্যুতে। সমাজ ক্রমশ আবেগপ্রবণ, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর একমাত্র পথ হলো—প্রয়োজনের স্বাভাবিক ক্রমে ফিরে যাওয়া। আগে মানুষ বাঁচবে, তারপর বিশ্বাস করবে। আগে পেট ভরবে, তারপর প্রার্থনা করবে। ধর্ম থাকবে মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে, আর রাষ্ট্র থাকবে মানুষের মৌলিক চাহিদার দায়িত্বে।
ধর্ম যদি মানুষের সহমর্মিতা বাড়ায়, নৈতিকতা শেখায়, তাহলে তা আশীর্বাদ। কিন্তু যদি ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে, প্রশ্নহীন করে তোলে, ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহৃত হয়—তাহলে তা সত্যিই আফিম। আর সেই আফিমের নেশা ধরিয়ে দিয়ে যারা দেশ চালাতে চায়, তারা ধর্মের নয়, ক্ষমতার পূজারি।









