প্রায় সবাই বলবেন ক্ষুদিরাম বসু … ভুল, একদম ভুল।
ক্ষুদিরামের বহু আগে এক সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়েছিল ইংরেজরা। দিনটি ছিল ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ই আগস্টে, নাম মহারাজা নন্দকুমার। ইতিহাসবিদ ও আইনজ্ঞদের মতে এটি দেশের প্রথম Judicial Killing বা আইনি হত্যা..
জন্ম ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে বীরভূমের ভদ্রপুর বলে এক জায়গায়। পলাশির যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন হুগলির ফৌজদার, পরবর্তীকালে নবাব মীরজাফরের দেওয়ান ছিলেন এবং কোম্পানি কর্তৃক দেওয়ানি লাভের অব্যবহিত পরে তিনি ছিলেন চার জন ঊর্ধ্বতন নায়েবের অন্যতম। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম তাঁকে ‘মহারাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন ।
সরকারি প্রশাসনিক কাজে‚ বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন তিনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে কর আদায়ের কাজে বহাল করে ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে – বর্ধমান‚ নদিয়া এবং হুগলি জেলায়। তার আগে এই দায়িত্বে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। কিন্তু তাঁর কাজে সন্তুষ্ট ছিল না কোম্পানি। এই অপসারণ মেনে নিতে পারেননি তিনি। তাঁকে সরিয়ে কিনা দায়িত্ব দেওয়া এক নেটিভকে! অপমানে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকেন সাহেব।
১৭৭৩ সালে হেস্টিংসকে বাংলার গভর্নর জেনারেল পদে আনা হল। এ বার তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত ভাবে দুর্নীতির অভিযোগ আনলেন নন্দকুমার। তাঁর অভিযোগ ছিল‚ মৃত নবাব মীরজাফরের স্ত্রী মুন্নি বেগমের কাছ থেকে বহু কোটি অর্থ ঘুষ নিয়েছিলেন হেস্টিংস। বিনিময়ে নাবালক নবাব মুবারক-উদ-দৌল্লার অভিভাবক হিসেবে মুন্নি বেগমকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন৷
মুখ বন্ধ রাখার জন্য এর থেকে বিশাল অর্থ নন্দকুমারকেও দিতে চেয়েছিলেন হেস্টিংস। কিন্তু তা না নিয়ে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন নন্দকুমার। মহারাজা নন্দকুমারকে সমর্থন করেন স্যর ফিলিপ ফ্রান্সিস এবং বেঙ্গল সুপ্রিম কাউন্সিলের অন্য সদস্যরা। হেস্টিংসের বিরোধী ছিলেন ফ্রান্সিস। কিন্তু কোনও লাভ হল না। কারণ ভারতের প্রথম চিফ জাস্টিস এলাইজা ইম্পে ছিলেন হেস্টিংসের স্কুলের বন্ধু। তিনি রায় দিলেন নন্দকুমারের বিপক্ষে।
আরও পড়ুনঃ মালদহে বিএলও-র মৃত্যু! এসআইআরের কাজের চাপকে দুষছে মৃতার পরিবার
ইতিমধ্যে নন্দকুমারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও তছরূপের অভিযোগ আনলেন হেস্টিংস। বললেন‚ জনৈক বোলাকি দাস শেঠের নাম ভাঙিয়ে ৭০ হাজার টাকা নিয়ে নিয়েছেন নন্দকুমার। আসল বোলাকি দাস শেঠ বহুদিন আগেই মৃত। এলাইজা ইম্পের দৌলতে এই অভিযোগ সত্যি বলে প্রমাণিত হল। ‘দোষী’ সাব্যস্ত হলেন মহারাজা নন্দকুমার। তখন ব্রিটিশ আইন অনুসারে দুর্নীতি‚ তহবিল তছরূপের শাস্তি ছিল প্রাণদণ্ড।
ফাঁসির দিন নির্ধারিত হল ১৭৭৫ সালের ৫ই আগষ্ট। মৃত্যুর স্থান নিজেই বেছেছিলেন মহারাজা নন্দকুমার। গঙ্গাকে সামনে রেখে মৃত্যুবরণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। পূর্ণ হয়েছিল তাঁর শেষ ইচ্ছে। নির্দিষ্ট দিনে খুব শান্ত ভাবে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন সত্তরোর্ধ্ব মহারাজা নন্দকুমার। শোনা যায় এইদিনে বহু ব্রাহ্মন কলকাতা ছেড়ে গঙ্গা পেরিয়ে হাওড়া চলে যান।
খিদিরপুর ব্রিজ থেকে হেস্টিংসের দিকে নামার দিকে হেস্টিংস মোড়ে একটি কুয়ো অনেকেরই চোখে পড়়ে থাকবে, ১৫ ফুট মতো গভীর। স্থানীয়ভাবে এই কুয়োটি ‘ফাঁসি কুয়ো’ নামে পরিচিত। মনে করা হয় এই স্থানেই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল মহারাজা নন্দকুমার কে, পরাধীন দেশের প্রথম বাঙালি.









