সোমেন দত্ত, কোচবিহারঃ
তারা বা আর্যতারা হলেন মহাযান বৌদ্ধধর্মের একজন নারী বোধিসত্ত্ব, যিনি বজ্রযান বৌদ্ধধর্মে একজন নারী বুদ্ধের মর্যাদা পান। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মেতাঁকে জেতসুন দোলমা (তিব্বতি ভাষা: বলা হয়। তিনি “নির্বাণ-জননী” হিসেবে পরিচিত। তারা কাজ ও কীর্তির গুণাবলির সাফল্যের প্রতিনিধি। জাপানে তিনি “তারা বোসাতসু” নামে পরিচিত। চীনা বৌদ্ধধর্মে তিনি দৌলাও পূসা নামে স্বল্প-পরিচিত।
তারা একজন তান্ত্রিক দেবী। বজ্রযানবৌদ্ধধর্মের তিব্বতি শাখাটি তাঁর ধ্যান অনুশীলন করে আন্তরিক গুণাবলির বিকাশ এবং দয়া ওশূন্যতার বাইরের, অন্তরের এবং গোপন শিক্ষা অনুধাবনের জন্য। একই শ্রেণীর বুদ্ধ বাবোধিসত্ত্বগণের গোষ্ঠীনাম হিসেবেও তারা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বোধিসত্ত্বেরা প্রায়শই বৌদ্ধ গুণাবলির উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হন। সেই দিক থেকে এই ধারণাটি আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
আরও পড়ুনঃ ছুটির দিনে কেমন থাকবে বঙ্গের আবহাওয়া
তারার সুপরিচিত রূপগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
হরিত তারা, (শ্যামাতারা) বোধিপ্রাপ্ত ক্রিয়াকর্মের বুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।শুক্লতারা, (সীতাতারা) দয়া, দীর্ঘজীবন, আরোগ্যদান ও শান্তি হিসেবে পরিচিত; এছাড়াও চিন্তাচক্র বা কল্পতরু চক্র হিসেবেও পরিচিত।রক্ততারা, (কুরুকুল্লা) সকল ভাল জিনিস চুম্বকীকরণের সঙ্গে যুক্ত ভয়াবহ রূপ।কৃষ্ণতারা, শক্তির সঙ্গে যুক্ত।পীততারা, (ভৃকুটিনীলতারাচিত্তমণি তারা, তারার একটি রূপ যা তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের গেলাগ শাখায় সর্বোচ্চ যোগ তন্ত্রেখদিরববনী তারা, দক্ষিণ ভারতের খদিরবনী বনে ইনি নাগার্জুনের সামনে আবির্ভূতা হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। এঁকে প্রায়শই “২২তম তারা” বলা হয়।
বৌদ্ধধর্মের কোনো কোনো সম্প্রদায়ে “একুশ তারা” স্বীকৃত। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের চারটি সম্প্রদায়ই সকালে একুশ তারা স্তোত্র আবৃত্তি করে।
কোনো কোনো বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও হিন্দুধর্মে তারার মন্ত্র একই: ওঁ তারে তুত্তারে তুরে স্বাহা। তিব্বতি প্রথাঅনুসারে তিব্বতি ও বৌদ্ধরা এটিকে উচ্চারণ করে “ওঁ তারে তু তারে তুরে সোহা”।
বৌদ্ধ দেবী রূপে তারার অভ্যুত্থান
তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে তারা হলেন দয়া ও কার্যের একজন বোধিসত্ত্ব। তিনি হলেন অবলোকিতেশ্বরেরনারী মূর্তি।
তারা নির্বাণদাত্রী রূপেও পরিচিত। কারণ তিনিই সেই স্বর্গীয় দেবী যিনি সংসারের দুঃখে তপ্তদের কান্না শুনতে পান।
তারার উৎস হিন্দু না বৌদ্ধ সেটি অস্পষ্ট। এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। মল্লার ঘোষ মনে করেন, তাঁর উৎস হিন্দু পুরাণ শাস্ত্র। সেখানে তাঁদের দেবী দুর্গার একটি রূপ বলা হয়েছে।] আধুনিক কালে বৌদ্ধধর্ম ও হিন্দুধর্মের শাক্ত সম্প্রদায়ে(দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী রূপে) তাঁর পূজা হয়।
পরবর্তীকালের বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ মঞ্জুশ্রীমূলকল্প-এ (খ্রিস্টীয় ৫ম-৮ম শতাব্দী) তারাকে বোধির দয়ার প্রতিমূর্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।] যে প্রাচীনতম মূর্তিটিকে তারামূর্তি হিসেবে চিহ্নিত করা গিয়েছে সেটি বৌদ্ধ মঠ চত্বর ইলোরা গুহায় (অধুনা ভারতের মহারাষ্ট্রে অবস্থিত) খ্রিস্টীয় ৭ম শতকে নির্মিত হয়েছিল। উত্তরপূর্ব ভারতে পাল সাম্রাজ্যের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হলে (খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দী) তারা পূজা জনপ্রিয় হয়।[
৮ম শতাব্দীতে পাল সাম্রাজ্যে তন্ত্রের অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তারা খুব জনপ্রিয় এক বজ্রযান দেবীতে পরিণত হন। পদ্মসম্ভবের মাধ্যমে ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম তিব্বতে পৌঁছালে তারার পূজানুশীলন তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের মধ্যেও ঢুকে পড়ে।] এরপর থেকে তাঁকে “সকল বুদ্ধগণের মা” হিসেবে গণ্য করা হতে থাকে। এটি অনেকটা হিন্দুধর্মের মাতৃকাদেবী ধারণার অনুরূপ।
দেবী হোক, বা বুদ্ধ হোক বা বোধিসত্ত্বই হোক, তারাতিব্বত (এবং উত্তর ভারতে নির্বাসিত তিব্বতি সম্প্রদায়ে), মঙ্গোলিয়া, নেপাল ও ভুটানে বেশ জনপ্রিয়। সারা বিশ্বের অধিকাংশ বৌদ্ধ সম্প্রদায় তারা পূজা করে। (আরও দেখুন, গুয়ানয়িন, চীনা বৌদ্ধধর্মে অবলোকিতেশ্বরের নারীরূপ)।
আধুনিক কালে হরিত তারা ও শুক্লতারা সম্ভবত তারার সবচেয়ে জনপ্রিয় মূর্তি। হরিত তারা ও খদিরবনী তারা সাধারণত ভয়ের থেকে রক্ষার সঙ্গে যুক্ত। আটরকম দ্বন্দ্ব থেকে রক্ষার সঙ্গেও তাঁরা যুক্ত: সিংহ (= অহংকার), বুনো হাতি (= অজ্ঞান), আগুন (= ঘৃণা ও ক্রোধ), সাপ (= ঈর্ষা), চোর ও ডাকাত (= ভুল মত, গোঁড়া মতবাদ সহ), বন্ধন (= লোভ ও কার্পণ্য), বন্যা (= কামনা ও বন্ধন) ও অপদেবতা ও দানব (= যে দ্বন্দ্ব বিভ্রান্ত করে)। দীর্ঘজীবনের তিন দেবীর একজন হিসেবে শুক্লতারা (বা সরস্বতী) দীর্ঘজীবনের সঙ্গে যুক্ত। তিনি রোগ প্রতিরোধ করেন এবং এভাবেই দীর্ঘজীবন দান করেন। তিনি দয়ার প্রতীক। তাঁর গাত্রবর্ণ সাদা এবং তিনি চাঁদের বলে উজ্জ্বল বলে কথিত।
সিতা (শুক্ল) তারা, ওনডোর গেগিন, জানাবাজার, মঙ্গোলিয়া, ১৭শ শতাব্দী।
মালদ্বীপীয় তারা-র ৩০ মিটার উচ্চ খোদাই চিত্র, ৯ম শতাব্দী। মালদ্বীপের মালের জাদুঘরে রক্ষিত।
তারা মন্ত্র
ওঁ তারে তুত্তারে তুরে স্বাহা
রঞ্জন ও তিব্বতি লিপির লাঞ্জা রূপভেদে।
ত্রাণকর্ত্রী রূপে তারা
তান্ত্রিক দেবী রূপে তারা
কেন্দ্রে হারিত তারা (সময় তারা যোগিনী) ও কোণে নীল, রক্ত, শ্বেত ও পীততারার মূর্তি
পদ্মসম্ভবের সময় থেকে তারা তান্ত্রিক দেব যোগেরকেন্দ্র। পদ্মসম্ভব ইয়েশে সোগ্যালকে রক্ততারার অনুশীলন পদ্ধতি দিয়েছিলেন। তিনি তাঁকে বলেন, এটিকে ধনসম্পত্তির মতো গোপন রাখতে। ২০শ শতাব্দীতে আপোং তেরতন নামে এক বিশিষ্ট ন্যিংমা লামা এটিকে প্রথম পুনরুদ্ধার করেন। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুসারে, এই লামাই সক্যপ শাখার বর্তমান প্রধান সক্য তিরজিন রূপে পুনরায় জন্মগ্রহণ করেছেন। আংপং তেরতনকে চিনতেন এমন এক ভিক্ষু এই পদ্ধতি সক্য তিরজিনকে দেন এবং তিনিই এটি চাগদুদ তুলকু রিংপোচকে দেন, যিনি এটি তাঁর পাশ্চাত্যের শিক্ষার্থীদের কাছে প্রকাশ করেন।
মার্টিন উইলসন তাঁর ইন প্রেইজ অফ তারা গ্রন্থে তারা তন্ত্রগুলির বিভিন্ন শাখার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন তারা-সংক্রান্ত ধর্মগ্রন্থগুলি তান্ত্রিক সাধন হিসেবে ব্যবহৃত হত। উদাহরণস্বরূপ, কর্ম কাগ্যুর মানব পিতা তিলোপার (৯৮৮-১০৬৯) কাছে একটি তারা সাধন প্রকাশিত হয়। বিশিষ্ট অনুবাদক তথা তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের কদমপা শাখার প্রতিষ্ঠাতাঅতীশ ছিলেন তারা ভক্ত। তিনি তারার একটি স্তোত্র ও তিনটি তারা তন্ত্র রচনা করেন। মার্টিন উইলসনের গ্রথে একটি তালিকা রয়েছে যেখানে বিভিন্ন শাখার তারা তন্ত্রগুলির উৎস দেখানো হয়েছে। তবে তারার তান্ত্রিক অনুশীলন ৭ম শতাব্দীর পর থেকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আজ পর্যন্ত বজ্রযান বৌদ্ধধর্মে তারা এক গুরুত্বপূর্ণ তান্ত্রিক দেবী।
বর্তমানে তারা অনুশীলন হয় একজন ইষ্টদেবতা (থাগ দাম, য়িদাম) হিসেবে। অনুশীলনকারীরা তাঁকে বুদ্ধ জ্ঞানের এক প্রত্যক্ষ মূর্তি হিসেবে দেখেন।
তারার সাধন
যে সকল সাধনে তারাকে য়িদম বা ধ্যানদেবী হিসেবে দেখানো হয়েছে সেগুলি হয় বিস্তারিত নয় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। এগুলির অধিকাংশের শুরুতে তাঁর স্তব রয়েছে। এই স্তবে তাঁকে আবাহন করা হয়েছে এবং তাঁর শরণ নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর তাঁর মন্ত্র পাঠ করা হয়েছে। এরপর সাধনের ফলে প্রাপ্ত বোধি উৎসর্গ করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর অতিরিক্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রার্থনা বা সাধনের সূত্রপাত যে লামা করেছিলেন, তাঁর দীর্ঘজীবনের প্রার্থনা করা হয়েছে। অনেক তারা সাধনকে বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের জগতের প্রারম্ভিক ধর্মানুশীলন হিসেবে দেখা হয়। যদিও এই দেবীকে আবাহনের জন্য দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করা হয়েছে তা বৌদ্ধধর্মের সকল শাখারই সূক্ষ্ম শিক্ষা। দুটি উদাহরণ হল জাবটিক দ্রোলচক ও চিমে পাকমে ন্যিংটিক









