মহম্মদ ইউনুসকে দেশ ও জাতির শত্রু বলে তীব্র আক্রমণ শোনালেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, প্রধান উপদেষ্টা পদে আসীন মোহাম্মদ ইউনুসই চক্রান্ত করে তাঁকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছেন। হাসিনার অভিযোগ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের সরকারের সময় গোটা বাংলাদেশই জেলখানায় পরিণত হয়েছে।
পূর্ব ঘোষণা মত শুক্রবার দিল্লিতে ফরেন কলেজ ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া আয়োজিত বাংলাদেশ বিষয়ক আলোচনা চক্রে অনলাইনে সংযুক্ত হন শেখ হাসিনা। ২০২৪-এর ৫ অগস্ট থেকে দিল্লিতে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লিগ নেত্রী। দেশ ছাড়ার কয়েক মাস পর থেকেই তিনি ভার্চুয়াল মাধ্যমে দেশবাসী এবং আওয়ামী লিগের নেতা কর্মীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন। হোয়াইটস অ্যাপ, টেলিগ্রাম এবং সিগন্যালের মত একাধিক প্লাটফর্মে তিনি নিয়মিত দলের তৃণমূল স্তরে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। এছাড়া আওয়ামী লিগের ফেসবুক পেজের নিয়মিত অনুষ্ঠান দায়মুক্তিতে অংশ নেন শেখ হাসিনা। তবে কোথাও তিনি ক্যামেরার মুখোমুখি হননি। শুক্রবারের অনুষ্ঠানেও তাঁকে ক্যামেরার সামনে আসতে দেখা যায়নি। তবে এই প্রথম দিল্লির কোন অনুষ্ঠানে সংযুক্ত হয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে দেশের দূরবস্থার কথা তুলে ধরলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
আরও পড়ুনঃ মুহুর্মুহ বিস্ফোরণ আর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী; ফের উদ্বেগ বাড়াল ভারত-চিন সীমান্ত! কিন্তু হলটা কি?
তবে লক্ষণীয় হলো হাসিনা যে ওই অনুষ্ঠানে অনলাইনে হাজির হলেন ভাষণে তা উল্লেখ করেননি। আগে থেকে রেকর্ড করা ভাষণ বাজানো হয়েছে কিনা তাও স্পষ্ট হয়নি। আরও লক্ষণীয় হলো অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিক এবং অন্য বক্তাদের উদ্দেশ্য নয়, হাসিনা ভাষণ শুরু করেন ’প্রিয় দেশবাসী আমি শেখ হাসিনা বলছি’ বলে। মনে করা হচ্ছে কূটনৈতিক জটিলতা এড়াতেই আওয়ামী লিগ নেত্রীকে এই কৌশল নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
দিল্লির অনুষ্ঠানটির আয়োজক ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রেসক্লাব। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আমন্ত্রণপত্রে উদ্যোক্তারা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলে উল্লেখ করেছেন। শুক্রবারে অনুষ্ঠানেও তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলে পরিচয় দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হাসিনা সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী তথা পরিচালক রোকেয়া প্রাচী। অনলাইনে সংযুক্ত হয়েছিলেন সাবেক আরো দুই মন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন এবং আলি আরাফাত। সকলেই তথ্য পরিসংখ্যান তুলে ধরে অভিযোগ করেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র মানবাধিকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। আলাদা করে সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন ও নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেন সব বক্তা। হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হয়েছে।
সরকারি ঘোষণা মত আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোট নেওয়ার কথা। আওয়ামী লিগকে ওই নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। পাল্টা হাসিনা তার সমর্থক ও ভোটারদের বলেছেন নির্বাচন বয়কট করতে। এই সভায় হাসিনার ভাষণ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কিনা তা নিয়ে কৌতুহল আছে। তবে ঢাকার কূটনৈতিক মহলের একাংশ জানিয়েছেন, তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভাষণকে বাড়তি গুরুত্ব নাও দিতে পারেন। বাংলাদেশ প্রশাসন মনে করছে নির্বাচনের সময় উত্তেজনা তৈরির উদ্দেশ্যে দিল্লির এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকার এই ব্যাপারে আপত্তি তোলেনি। তবে বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, তাঁরা চান না সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতে বসে বিবৃতি দিন।
রাজনৈতিক অবসরের যাবতীয় জল্পনা ফুৎকারে উড়িয়ে প্রত্যাবর্তনের বার্তা বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা। শুক্রবার দিল্লিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অডিও বার্তায় বাংলাদেশে উপদেষ্টা সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুসকে সুদখোর, ফ্যাসিস্ট, খুনি, দুর্নীতিগস্ত বলে তোপ দাগার পাশাপাশি গোটা দেশে অভ্যুত্থানের ডাক দেন তিনি। বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনের আগে হাসিনার এই বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূলের প্রতিমা-প্রক্সি! মণ্ডপ থেকে উধাও দেবী সরস্বতী
শুক্রবার দিল্লির সভায় হাসিনা ভাষণে মহম্মদ ইউনুসের পদত্যাগ দাবি করার পাশাপাশি নতুন সরকারের অধীনে নির্বাচন করার আর্জি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য বাংলাদেশ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হলে মহম্মদ ইউনুসকে এখনই ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে। ইউনুসের সময়ে সংঘটিত হিংসা এবং অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের তদন্তে রাষ্ট্রসংঘের টিম পাঠানোর দাবি তোলেন আওয়ামী লিগ নেত্রী।
দিল্লিতে ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনায় শুক্রবার উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত প্রাক্তন মন্ত্রী ও শিল্পীরা। সেখানেই অডিও বার্তায় হাসিনা বলেন, “একটা সময়ে স্বাধীনতার যে মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম, সেই একই মন্ত্রে আবারও গোটা দেশকে উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান করছি আমি।” বর্তমান সরকারকে ফ্যাসিবাদী, দুর্নীতিগ্রস্ত বলে তোপ দেগে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে গলা টিপে খুন করা হচ্ছে, মানবাধিকার পদদলিত, সর্বত্র হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও তোলাবাজি চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে।”

গুরুতর এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণের কাছে তাঁর আবেদন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জেগে উঠুন। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করুন। আমাদের মাতৃভূমির আত্মাকে কলঙ্কিত করা হচ্ছে।” নিজের দলের প্রশংসা করে শেখ হাসিনা আরও বলেন, “গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তিগুলিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আওয়ামি লিগ পুরোনো পার্টি। এবং আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে উদ্ধার করতে বদ্ধপরিকর”।
শান্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথাও এদিন তুলে ধরেন হাসিনা। সেগুলি হল,
- বর্তমান প্রশাসনকে অপসারণ করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করুন। ভয় দেখিয়ে ভোটারদের যাতে প্রভাবিত না করা হয় তা নিশ্চিত করুন।
- অবিলম্বে হিংসা বন্ধ করে বেসামরিক সংস্থাগুলিকে স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি দিতে হবে যাতে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যায়।
- সংখ্যালঘু ও মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ হিংসার কবলে না পড়েন।
- সাংবাদিক এবং বিরোধী নেতাদের ভয় দেখানো বন্ধ করুন এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনুন।
- গত বছরের ঘটনাবলীর পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানান।








