ডিজিটাল প্রতারকদের ডেরায় হানা। নতুন আর কী, আধুনিক পুলিশি জীবনের আক্ষরিক অর্থেই রোজনামচা। কিন্তু পরশু, অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি, আমহার্স্ট স্ট্রিটের পাটোয়ারি বাগান লেনের একটি বাড়িতে ‘রেইড’ করে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় পুলিশের পোড়খাওয়া গোয়েন্দাদেরও। আবিষ্কার হয় আন্তর্জাতিক ভিওআইপি (VoIP) কল-কে লোকাল কলে রূপান্তরিত করার এক বিশাল, সম্পূর্ণ বেআইনি পরিকাঠামো, বা ‘টেলিকম গেটওয়ে’। স্বচ্ছন্দে বলা যায়, পূর্ণাঙ্গ এক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা।
আরও পড়ুনঃ খন্দকার মোশাররফ হোসেন না কি নজরুল ইসলাম খান! বাংলাদেশের চর্চায় নতুন রাষ্ট্রপতি
মামলার কেন্দ্রে ৩ কোটির কিছু বেশি টাকার জালিয়াতি। সিবিআই অফিসার সেজে, তথাকথিত অবৈধ পার্সেল পাচারের অভিযোগ এনে, গ্রেফতারির ভয় দেখিয়ে, জাল নথিপত্র পেশ করে বিপুল পরিমাণে টাকা আদায়। যেমন আজকাল হয়ে থাকে আকছার। এই মামলার সূত্র ধরেই ‘রেইড’। এবং তারপর সেই আবিষ্কার।
প্রযুক্তির কচকচিতে না গিয়েও বলা, দুটি নম্বর থেকে ফোন পান অভিযোগকারী। তদন্তে দেখা যায়, এই কলগুলি সাধারণ মোবাইল থেকে করা হয়নি, করা হয়েছে ‘সিম বক্স’ নামে একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে। এটি এমন এক ডিভাইস, যাতে একসঙ্গে বহু সিম কার্ড বসিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কল-কে সাধারণ লোকাল কলের মতো দেখানো যায়। সোজা কথায়, এতে আসল কল-এর উৎস লুকিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। ফলে সরকারি নিয়ম এড়িয়ে বিপুল পরিমাণ কল ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।

তদন্তে আরও জানা যায়, কলকাতার বাগুইআটি, রাজাবাজার ও এসপ্ল্যানেড এলাকায় এই ধরনের সিম বক্স নেটওয়ার্ক চালাত আবির শেখ নামে এক ব্যক্তি। ব্যবহার করত ভার্চুয়াল নম্বর ও বাংলাদেশের ভিপিএন (VPN), যাতে তার আসল অবস্থান গোপন থাকে। তদন্তে সামনে আসে তার মালয়েশিয়া-যোগও, চিহ্নিত করা হয় কিছু সহযোগীকে, যারা তাকে সিম কার্ড সরবরাহ করত।
বেশ কিছুদিন নজরদারির পর টেলিযোগাযোগ দফতরের তথ্যের ভিত্তিতে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে বাগুইআটির হাতিয়ারা এলাকা থেকে আবির শেখকে একটি সিম বক্স সমেত গ্রেফতার করে বিধাননগর কমিশনারেট। তার বয়ানের সূত্র ধরে ১৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতা পুলিশের টিম পৌঁছয় আমহার্স্ট স্ট্রিট ও পার্ক স্ট্রিট থানা এলাকায়।
পাটোয়ারি বাগান লেনের সেই বাড়িতে একটি সচল ‘সিম বক্স’ সেটআপ ভেঙে ফেলা হয়, এবং উদ্ধার হয় একাধিক বড় ‘সিম বক্স’ মেশিন, একটি ল্যাপটপ, ৯টি রাউটার, ১৭টি মোবাইল ফোন, ২,২৫০টি সিম কার্ড, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, এবং কিছু মালয়েশিয়ান মুদ্রা। ‘সিম বক্স’-গুলিতে একসঙ্গে বসানো ছিল বহু সক্রিয় সিম, এবং সম্পূর্ণ কার্যকলাপ দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো ল্যাপটপ ও রাউটার-এর সাহায্যে। গ্রেফতার করা হয়েছে আবিরের সহযোগী মহম্মদ আমজাদ (৩৮) নামে এক ব্যক্তিকেও।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আদতে বাংলাদেশি নাগরিক আবির অবৈধ কল রাউটিং-এর কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। তবে আমাদের তদন্ত অনুযায়ী, এই চক্রের পাণ্ডা ত্রিপুরার বাসিন্দা বিপ্লব হোসেন। সঙ্গে চুং ওয়েই কিয়াত নামে এক মালয়েশিয়ার নাগরিকও, যে ভারতে আসত চিকিৎসা ভিসায়। এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা যুক্ত এবং এর আন্তর্জাতিক যোগ কতটা বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে।
পরিশেষে আরও একবার বলা, কোনও তথাকথিত সরকারি সংস্থা আপনাকে ফোন করে কোনোরকম চাপ সৃষ্টি করলে তা উপেক্ষা করুন অনায়াসে। প্রয়োজন মনে করলে কলকাতা পুলিশকে জানান। মনে রাখবেন, সরকারিভাবে আপনাকে ডেকে পাঠাতে হলে আইনত লিখিত সমন বাধ্যতামূলক। হোয়াটসঅ্যাপ কল নয়।









