বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর বিখ্যাত হাতের আংটিটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক রহস্য। সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন সামাজিক ফোরামে দাবি করা হচ্ছে, খামেনির আংটির মধ্যে নাকি বসানো ছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’-এর অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি আড়িপাতার প্রযুক্তি (Eavesdropping Device)। গুঞ্জন ছড়িয়েছে, “শামা হাকোল” (হিব্রু ভাষায় যার অর্থ ‘সে সবকিছু শুনেছে’) ছদ্মনামের এক কভার্ট এজেন্ট নাকি এই মিশনটি সফল করে নিরাপদে ইসরায়েলে ফিরে গেছেন।
স্পাই-থ্রিলার বা হলিউড সিনেমার মতো মনে হলেও, গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই দাবিকে একেবারে হেসেই উড়িয়ে দিতে পারছেন না। আবার অন্যদিকে একে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের (Psychological Warfare) অংশ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
আরও পড়ুনঃ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অমঙ্গল সংকেত! ‘অ্যালার্ট মোডে’ NATO
কেন এই খবরটি আলোচনায় স্থান পাচ্ছে? (দাবির স্বপক্ষে যুক্তি)
গোয়েন্দা ইতিহাস এবং মোসাদের অতীতের কিছু কৌশল পর্যবেক্ষণ করলে এমন ন্যানো-প্রযুক্তির ব্যবহারকে সম্পূর্ণ অসম্ভব বলা যায় না:
-
হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (HUMINT) ও গভীর অনুপ্রবেশ: মোসাদ অতীতেও ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। তেহরানের ভেতরে পরমাণু বিজ্ঞানী মহসেন ফখরিজাদেহকে রিমোট-কন্ট্রোলড অস্ত্রের সাহায্যে হত্যা বা পারমাণবিক নথি চুরির ঘটনা প্রমাণ করে যে, তাদের নেটওয়ার্ক কতটা গভীর।
-
মাইক্রো-প্রযুক্তি ও পেজার বিস্ফোরণের স্মৃতি: সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননে পেজার ও ওয়াকিটকি বিস্ফোরণ কিংবা ১৯৭০-এর দশকের ‘অপারেশন এনটেবে’-র মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, আধুনিক যোগাযোগ ও ক্ষুদ্র গ্যাজেট ব্যবহারে তারা কতটা অগ্রগামী। একটি আংটির পাথরের নিচে মাইক্রো-চিপ বসানো প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয়।
-
ছদ্মনামের ইঙ্গিত: হিব্রু শব্দ ‘শামা হাকোল’ (שמע הכל)-এর আক্ষরিক অর্থ ‘সবকিছু শুনেছে’। গোয়েন্দা সংস্থায় এমন সাংকেতিক কোড নেম ব্যবহার করা এবং কাজ শেষে শত্রুপক্ষের মনোবল ভাঙতে তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়।
আরও পড়ুনঃ ‘নন্দীগ্রাম থেকে নবান্ন’ রুবি মোড়ে হিন্দু মহাসভার দুর্গা পূজায় শিশির অধিকারীকে আমন্ত্রণ চন্দ্রচূড় গোস্বামীর
বাস্তবতা নাকি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ? (সংশয় ও প্রশ্নাবলী)
যদিও ঘটনাটিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ও নিরাপত্তাজনিত অসামঞ্জস্যতা তুলে ধরেছেন:
| মূল প্রশ্ন | সন্দেহ ও বৈজ্ঞানিক প্রতিবন্ধকতা |
| পাওয়ার ও ট্র্যান্সমিশন | অতি ক্ষুদ্র কোনো আড়িপাতার ডিভাইসে দীর্ঘ সময় ধরে সিগন্যাল ট্র্যান্সমিট করার জন্য ব্যাটারি এবং নেটওয়ার্ক কভারেজ কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। |
| সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বলয় | ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ব্যবহারের জন্য আসা যে কোনো উপহার বা ব্যক্তিগত সামগ্রী বহু স্তরের রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি, স্ক্যানার ও ইলেকট্রনিক কাউন্টার-মেজার্স (ECM) দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। |
| অফিসিয়াল স্বীকারোক্তির অভাব | মোসাদ বা ইসরায়েল সরকার কখনোই তাদের সক্রিয় গোপন মিশনের কথা স্বীকার বা অস্বীকার করে না। ফলে এই ধরনের লিকেজ প্রায়শই গুঞ্জন বা সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ারের অংশ হয়। |
সংবাদ বা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির ‘আংটি রহস্য’ আদতে কোনো সফল গোয়েন্দা অপারেশনের বাস্তব দলিল, নাকি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার অলৌকিক ক্ষমতার একটি প্রোপাগান্ডা বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব (Conspiracy Theory)—তা হয়তো নিকট ভবিষ্যতে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। তবে এই খবরটি যে বিশ্ব রাজনীতি ও নেটদুনিয়ায় নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।


