বিশেষ সংবাদ প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি:
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ECI) অন্দরে চরম বিভাজন ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠল দেশীয় রাজনীতি। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত বিস্ফোরক অন্তর্তদন্তমূলক রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার দিল্লি সহ দেশের সমস্ত রাজ্যে একযোগে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করল কংগ্রেস সহ সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
বিকেল গড়াতেই দিল্লিতে ব্যারিকেড ভাঙা, জলকামান প্রয়োগ এবং রাহুল গান্ধীর সুর চড়ানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে।
আরও পড়ুনঃ চরম অস্বস্তিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার! এবার সুপ্রিম কোর্টে মামলা
কী উঠে এসেছে বিতর্কিত রিপোর্টে?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অপর দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।
-
ভোটার তালিকার অস্বচ্ছতা: বিশেষ জোরপূর্বক সংশোধন (SIR)-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার নাম বাদ দেওয়া ও নতুন নাম যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ।
-
সহকর্মীদের আপত্তি উপেক্ষা: দুই নির্বাচন কমিশনার সঁধু ও জোশী যৌথ সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানালেও অন্তত ১৪ বার তাঁদের আপত্তি বাতিল বা উপেক্ষা করা হয়েছে।
রিপোর্টটি জনসমক্ষে আসতেই কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সাংবাদিক বৈঠক করে সরাসরি একে “গণতন্ত্রের ওপর চরম আঘাত” বলে আখ্যা দেন এবং অবিলম্বেই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানান।
দিল্লি স্তব্ধ: ব্যারিকেড ভাঙলো যুব কংগ্রেস, যোগেন্দ্র যাদব সহ বহু আটক
শুক্রবার সকাল থেকেই রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর (নির্বাচন সদন)-এর অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল জড়ো হতে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় বিপুল পুলিশ ও আধাসেনা।
| স্থান / সংগঠন | বিক্ষোভের রূপরেখা ও প্রশাসনিক অ্যাকশন |
| ভারতীয় যুব কংগ্রেস | রায়সীনা রোড থেকে নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত মিছিল। জ্ঞানেশ কুমারের মুখোশ পরে ও হাতে প্রতীকী হাতকড়া পরে স্লোগান দেন কর্মীরা। |
| ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা | দিল্লি কংগ্রেসের সভপতি দেবেন্দ্র যাদবের নেতৃত্বে কর্মীরা কমিশন অফিসের দিকে যেতে চাইলে পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে যায়। |
| নেতৃবৃন্দকে আটক | দুপুর ২টোর পর নিয়মমাফিক অনুমতি না থাকার অজুহাতে প্রখ্যাত সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, আইসা (AISA) নেত্রী নেহা বরা, অঞ্জলি ভরদ্বাজ এবং সিপিআই(এমএল) নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। |
দিল্লি কংগ্রেস সভাপতি দেবেন্দ্র যাদব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অবিলম্বে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চাই। ভারতবর্ষে এভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হবে আর আমরা চুপ করে বসে থাকব, তা হতে পারে না। এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকে শাস্তি পাবেন।”
আরও পড়ুনঃ সাংবাদিকতার তথ্যে নড়ে উঠল নির্বাচন কমিশন; নেপথ্যে কলকাতার মেয়ে ঋতিকা চোপড়া
শ্রীনগর থেকে পুদুচেরি: দাবানলের মতো ছড়াল প্রতিবাদ
কেবল দিল্লিতেই নয়, শুক্রবার উত্তর থেকে দক্ষিণ এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম—দেশের প্রায় প্রতিটি বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে এই বিক্ষোভের আঁচ:
-
অসম: গুয়াহাটিতে বিশাল প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় জেলা কংগ্রেস প্রধান তথা সাংসদ গৌরব গগৈ সহ বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে পুলিশ আটক করে।
-
পাটনা (বিহার): বিহারে প্রধান নির্বাচন আধিকারিকের (CEO) দপ্তরের দিকে মিছিল এগিয়ে গেলে ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও কড়া জলকামান (Water Cannon) প্রয়োগ করে।
-
অন্যান্য রাজ্য: কলকাতা, শ্রীনগর, শিমলা, ইম্ফল, দেহরাদূন, জম্মু ও পুদুচেরিতেও বিরোধী দলগুলির হাজার হাজার সমর্থক রাস্তায় নেমে সিইসি-র কুশপুত্তলিকা দাহ করেন এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার দাবি জানান।
সার্বিক পরিস্থিতিতে শাসক দল ও নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক ও আইনি চাপ এখন চরমে পৌঁছেছে।


