বিশেষ সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি:
কোকিলকণ্ঠের জাদুতে যিনি টানা কয়েক দশক ধরে মাতাল করে রেখেছিলেন দেশ-বিদেশকে, যাঁর কণ্ঠসীমানা পেরিয়ে তৈরি করেছিল এক চিরন্তন সুরের ভুবন—তিনি সুরসম্রাজ্ঞী, ভারতের ‘নাইটিঙ্গেল’ লতা মঙ্গেশকর। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে অগুনতি অনুরাগী ও সঙ্গীতজগৎ।
আরও পড়ুনঃ জোটে জট; জোট বাঁধন তৈরি হবে কি, তার আগেই ভাঙন! বৈঠকে থাকবেন না অখিলেশ; ‘হাত’ ছাড়ছে শরিকরা
শৈশব থেকে সুরের জগতে উত্থান
-
জন্ম ও নামকরণ: ১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে জন্ম নেন লতা মঙ্গেশকর। তাঁর জন্মসূত্রে নাম রাখা হয়েছিল ‘হেমা’। তবে বাবা পণ্ডিত দিনানাথ মঙ্গেশকরের বিখ্যাত মারাঠি নাটক ‘ভাব বন্ধন’-এর ‘লতিকা’ চরিত্রের অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে তাঁর নাম রাখা হয় ‘লতা’।
-
সঙ্গীত শিক্ষার সূচনা: খ্যাতনামা নাট্যশিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞ বাবার কাছে মাত্র ৫ বছর বয়সে গানের তালিম শুরু হয় তাঁর। ১৯৩৮ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে সোলাপুরের নূতান থিয়েটারে জীবনের প্রথম স্টেজ পারফর্ম করেন তিনি।
-
কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া গান: ১৯৪২ সালে প্রথম মারাঠি ছবির জন্য গান গাইলেও তা চূড়ান্ত সম্পাদনায় বাদ যায়। অবশেষে ১৯৪৯ সালে ‘মহল’ ছবির ঐতিহাসিক গান ‘আয়েগা আনেওয়ালা’-র বিপুল সাফল্য তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রথম দিকে চড়া ও মিহি কণ্ঠস্বরের অজুহাতে কাজ না পেলেও, সময়ের সাথে সাথে তিনি নিজেকে ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পের অপরিহার্য স্তম্ভে পরিণত করেন।
আরও পড়ুনঃ ১০ দিন ক্লাস বন্ধ ঘোষণা, পরীক্ষা স্থগিত; উত্তাল পঞ্জাবের বিশ্ববিদ্যালয়
লতা মঙ্গেশকর: এক নজরে অবিস্মরণীয় মাইলফলক
| ক্ষেত্র / অর্জন | ঐতিহাসিক তথ্য ও স্মৃতি |
| ভাষা ও গান | ৩৬টিরও বেশি ভাষায় ৩০ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন। |
| সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ | সুরকার হিসেবেও তাঁর অনন্য অবদান রয়েছে। ১৯৫৫ সালে ‘রাম রাম পাভহানে’ ছবির পাশাপাশি কিশোর কুমারের বিখ্যাত বাংলা গান ‘তারে আমি চোখে দেখিনি’-তেও তিনি সুর দিয়েছিলেন। |
| ‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ’ | ১৯৬৩ সালের ২৭ জানুয়ারি দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১৯৬২-র ইন্দো-চীন যুদ্ধের শহীদ জওয়ানদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে লতাজির কণ্ঠে এই গান শুনে অশ্রুসজল হয়ে পড়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। |
| আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি | লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে পারফর্ম করা প্রথম ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন তিনি। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। |
| ক্রিকেট প্রীতি | ১৯৮৩ সালে ভারতের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের পর বিজয়ী দলের জন্য অর্থ সংগ্রহে বিনামূল্যে কনসার্ট করেছিলেন তিনি। ২০১১ সালের বিশ্বকাপ জয়েরও প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। |
| সংসদ সদস্য ও শেষ গান | ১৯৯৯ সালে রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে মনোনীত হন। সেনাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০১৯ সালের ৩০ মার্চ প্রকাশিত ‘সুগন্ধ মুঝে ইস মিট্টি কি’ ছিল তাঁর গাওয়া শেষ আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিপ্রাপ্ত গান। |
সঙ্গীত জগতে অভূতপূর্ব ও অতুলনীয় অবদানের জন্য তিনি ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ এবং চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত হন। সুরসম্রাজ্ঞী আজ শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও, তাঁর সৃষ্টি করা চিরন্তন সুর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।


