বিশেষ সংবাদ প্রতিনিধি:
আগামী ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব মেরুকরণের সলতে পাকানো শুরু হয়েছে। বিজেপির অগ্রগতি ঠেকাতে এবং ‘ইন্ডি’ (INDIA) জোটকে সুসংহত করতে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএমের মধ্যে আসন সমঝোতা বা এক ধরনের অঘোষিত আন্ডারস্ট্যান্ডিং তৈরি হতে চলেছে— এমন তথ্য উঠে উঠে আসছে ও বিভিন্ন সুত্র মারফৎ জানা যাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ও দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সর্বভারতীয় পর্যায়ে বিরোধীদের একজোট করার যে তৎপরতা শুরু হয়েছে, তার অলিখিত প্রভাব পড়তে চলেছে রাজ্য রাজনীতিতেও।
জাতীয় রাজনীতি ও আলিমুদ্দিন-কালীঘাট অক্ষ
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সিপিআই(এম-এল)-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির উদ্যোগে সর্বভারতীয় স্তরে বিরোধী ঐক্য জোরদার করার কাজ শুরু হয়েছে।
-
এম এ বেবির চিঠি ও ফোনালাপ: সম্প্রতি ২৩ সেপ্টেম্বর এম এ বেবি দিল্লির কার্যালয় থেকে ইন্ডি জোটের শক্তি বাড়াতে বিরোধী দলগুলোকে চিঠি পাঠান, যার অনুলিপি পৌঁছে যায় তৃণমূলের কাছেও। এর পর তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সরাসরি ফোনালাপ হয় এবং দিল্লিতে জোটের বৈঠক ডাকার বিষয়ে আলোচনা এগোয়।
-
মমতার বার্তা: ইতিপূর্বেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী ঐক্যের ডাক দিয়ে “লাল, নীল, হলুদ কোন্দল না দেখে” একসঙ্গে লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছিলেন।
২০২৯-এর সম্ভাব্য আসন সমঝোতার অঙ্ক
সংবাদ বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে একটি সমঝোতার রূপরেখা তৈরি হতে পারে:
| দল | সম্ভাব্য আসন বণ্টন ও সমীকরণ |
| সিপিএম / বামফ্রন্ট | আসন সমঝোতার সূত্রে তৃণমূল প্রায় ১০ থেকে ১২টি আসন বামেদের ছাড়তে পারে। |
| তৃণমূল কংগ্রেস | অবশিষ্ট ৩০ থেকে ৩২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে শাসকদল। |
তবে এই সমঝোতা সরাসরি প্রকাশ্য কোনো মহাজোটের বদলে ‘আসন ছাড়’-এর কৌশলী রাজনীতি বা অঘোষিত সমীকরণ হিসেবেই বেশি দেখা যেতে পারে, যাতে স্থানীয়স্তরে কর্মী-সমর্থকদের ক্ষোভ এড়ানো যায়।
আরও পড়ুনঃ জোটে জট; জোট বাঁধন তৈরি হবে কি, তার আগেই ভাঙন! বৈঠকে থাকবেন না অখিলেশ; ‘হাত’ ছাড়ছে শরিকরা
রাজ্য সিপিএমের দ্বিধা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ
তবে সর্বভারতীয় নেতৃত্বের এই উদ্যোগে বঙ্গ সিপিএমের অন্দরে ও নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরির প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
১. রাজ্য নেতৃত্বের অবস্থান: সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন যে, “দিল্লিতে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে একজোট হলেও বাংলায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত থাকবে।”
২. কর্মীদের প্রতিক্রিয়া: নিচুতলার অনেক বামপন্থী সমর্থক ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন তরুণ নেতৃত্বের দাবি, তৃণমূলের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত দলের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা হলে দল ছাড়ার বা রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।
৩. বিজেপির নজর: বিজেপি নেতৃত্বও বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের মতে, লোকসভা বা ‘এক দেশ এক ভোট’ পরিস্থিতিতে রাজ্য ও কেন্দ্রে বিজেপিকে রুখতে বাম-তৃণমূলের অঘোষিত ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।
বর্ষীয়ান প্রাবন্ধিকদের মতে, ২০১৬ সালে যেভাবে সমস্ত অতীত রাজনৈতিক শত্রুতা ভুলে হাত ধরেছিল সিপিএম ও কংগ্রেস, ঠিক তেমনই ২০২৯ সালের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে তৃণমূল-বাম গোপন বোঝাপড়া রাজ্য রাজনীতির নতুন মোড় হতে পারে।


