বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিনিধি:
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম কয়েক মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চরম সংঘাতের মুখোমুখি শাসক ও বিরোধী শিবির। রাজ্য অপরাধ নথি ব্যুরোর (SCRB) তথ্য সামনে এনে বিজেপির নতুন প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তথ্য জানার অধিকার (RTI) আইনের জবাবে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজ্যে ২,৪৫৪টি ধর্ষণ, ৬০০টি খুন, ১৩,১১৪টি খুনের চেষ্টা এবং ৩২,৩৪১টি গুরুতর আঘাতের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এই জলজ্যান্ত তথ্যকে হাতিয়ার করে অবিলম্বে বিশেষ বিধানসভা অধিবেশন ডাকার জোর দাবি তুলেছে তৃণমূল।
তবে বিজেপি শিবির এই পরিসংখ্যানকে নতুন সরকারের আমলের অপরাধ বলে মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এগুলো আদতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পাওয়ার পর নথিভুক্ত হওয়া পূর্ববর্তী শাসনকালের জমে থাকা অপরাধের এফআইআর (FIR)।
আরও পড়ুনঃ ‘কেমন দুঃসাহস হয়েছে….’, দিল্লি যাওয়ার আগে ‘বিকাশ দা’-কে নিয়ে লম্বা পোস্ট মমতার
পাঁচ মাসের অপরাধ চিত্র: আরটিআই (RTI) রিপোর্টের খতিয়ান
তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ সাকেত গোখলের দায়ের করা আরটিআই-এর জবাবে রাজ্য অপরাধ নথি ব্যুরো (SCRB) ১ মে থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমার এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
| সময়কাল / মাস | ধর্ষণের মামলা | খুনের ঘটনা | খুনের চেষ্টা | গুরুতর আঘাত |
| মে | ৩৪৯ | ১২৫ | ২,৯৪৭ | ৭,৭৯৪ |
| জুন | ৩৮৯ | ১৩৪ | ২,৫৬২ | ৬,১৯১ |
| জুলাই | ৭৮৬ (সর্বাধিক) | ১৩৩ | ৩,০৯৬ | — |
| আগস্ট | ৪৫৯ | ১১১ | ২,৪৯৮ | — |
| ১-২৪ সেপ্টেম্বর | ৪৭১ | ৯৭ | ২,০১১ | — |
| মোট পরিসংখ্যান | ২,৪৫৪ | ৬০০ | ১৩,১১৪ | ৩২,৩৪১ |
নথি অনুযায়ী, কেবল জুলাই মাসেই রেকর্ড ৭৮৬টি ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছে, যা মে মাসের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
‘আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, অধিবেশন ডাকা হোক’: শানিত তোপ তৃণমূলের
এই তথ্য সামনে আসার পরই রাজ্য সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পরিস্থিতির গরমিল নিয়ে সুর চড়িয়েছেন তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই তথ্যকে বিজেপি সরকারের শাসনের প্রকৃত ছবি বলে তোপ দেগেছেন।
একই সুর ধরে তৃণমূল বিধায়ক ও মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, “নারী নিরাপত্তা ও রাজ্য সুরক্ষার যে দাবি শাসক দল করছিল, এই সরকারি নথিই তার আসল চেহারা ফাঁস করে দিয়েছে। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে অবিলম্বে রাজ্য বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডেকে জবাবদিহি করতে হবে সরকারকে।”
‘নথিভুক্ত হওয়া মানেই এখনকার অপরাধ নয়’: বিজেপির পাল্টা যুক্তি
তৃণমূলের তোপের মুখে পড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিজেপি। শাসকদলের স্পষ্ট যুক্তি, কোনো ঘটনা নির্দিষ্ট সময়ে ‘নথিভুক্ত হওয়া’ এবং সেই ঘটনা ‘সেই সময়েই সংঘটিত হওয়া’—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
-
পুরনো কেসের নথিভুক্তকরণ: বিজেপির দাবি, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এমন বহু অভিযোগ পুলিশের খাতায় স্থান পেয়েছে, যা আগের সরকারের আমলে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।
-
রাজনৈতিক হিংসার পুরনো তথ্য: ২০১৬, ২০২১ এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসার সময়ের অগণিত মামলা এতদিনে নথিভুক্ত করার সুযোগ পেয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
-
স্বচ্ছতার দাবি: বিজেপি নেতৃত্বের স্পষ্ট বক্তব্য—অপরাধীদের আড়াল না করে পুলিশ এখন অবাধে এফআইআর নিচ্ছে, যার ফলেই এই পরিসংখ্যান বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরও পড়ুনঃ বাংলায় নজিরবিহীন সন্ত্রাস! বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়িতে দুষ্কৃতী হামলা
বিতর্কের মূল নির্যাস
রাজ্য অপরাধ নথি ব্যুরোর দেওয়া মে থেকে সেপ্টেম্বরের এই বিপুল সংখ্যা নিয়ে কোনো পক্ষেরই সংশয় নেই। আসল সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু—ঘটনাগুলোর সংঘটনকাল। কতগুলি অপরাধ সত্যিই নতুন সরকারের আমলে ঘটেছে আর কতগুলি পুরনো জমানার জমে থাকা আইনি প্রক্রিয়া, সেই উত্তর না মেলা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও আইনি অলিন্দে এই বিতর্ক তুঙ্গে থাকবে।


