বিশেষ আইনি প্রতিনিধি, কলকাতা:
বাঙালির দুর্গোৎসবে রাস্তার মোড়ে কিংবা মণ্ডপের প্রবেশদ্বারে বামপন্থীদের লাল শালু ঘেরা বইয়ের স্টল বহু দশকের চেনা ঐতিহ্য। কিন্তু উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ ও নৈহাটিতে এবার সেই ঐতিহ্যবাহী বুকস্টল বসানো কেন্দ্র করে তৈরি হলো চরম রাজনৈতিক ও আইনি সঙ্ঘাত। পুলিশি অনুমতি না মেলা এবং স্টল তৈরির নির্দিষ্ট জায়গায় অন্য সংগঠনের জবরদখলকে কেন্দ্র করে মামলা গড়ায় সোজা কলকাতা হাইকোর্টে। মঙ্গলবার এই মামলার শুনানিতে রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য স্পষ্ট ভাষায় জানতে চাইলেন—বই বিক্রিতে পুলিশের বাধা দেওয়ার কী যুক্তি থাকতে পারে?
আরও পড়ুনঃ ‘আপনি জঙ্গি…’, আমেরিকায় ‘জনরোষের’ শিকার হুইলচেয়ারে বসা ইউনুস! কর্মফল খুবই ভয়ানক
হাইকোর্টে বিচারপতির তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
মঙ্গলবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। শুনানির শুরুতে সরকারি কৌঁসুলি বেঞ্চ বদলের প্রসঙ্গ তুললেও বিচারপতি সাফ জানিয়ে দেন যে, উৎসবের মরশুমের কথা মাথায় রেখে পদ্ধতিগত জটিলতায় মামলা ঝুলিয়ে না রেখে এই এজলাসই দ্রুত শুনানি করবে।
বিচারপতি রাজ্য সরকারের উদ্দেশে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, “সিপিআইএম তো অস্থায়ী বুকস্টল করতে চায়, পুলিশ তাতে বাধা দিচ্ছে কেন? ওঁনারা তো বই বিক্রি করতে চান, কোনো খাদ্যসামগ্রী বা বিশৃঙ্খলা তৈরির জিনিস তো বিক্রি করছেন না।” এরপর আগামীকালের (বুধবার) মধ্যে রাজ্য সরকারকে হলফনামা দিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে আদালতকে জানানোর কড়া নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
সিপিআইএমের অভিযোগ ও হিন্দু জাগরণ মঞ্চ বিতর্ক
মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী শামিম আহমেদ আদালতে জানান, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে নির্দিষ্ট জায়গায় পুজোয় তারা বুকস্টল করে আসছেন, এবার নৈহাটি ও বনগাঁ—উভয় জায়গাতেই স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসন তাতে অনুমতি দেয়নি। শুধু তাই নয়, দলের অভিযোগ—নৈহাটিতে তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রতি বছর যেখানে বুকস্টল বসে, সেই জায়গা জবরদখল করে অন্য একটি সংগঠন—‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’ সেখানে একটি অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করে ফেলেছে।
সিপিআইএমের অভিযোগ, বাঁশ ও ত্রিপল নিয়ে কর্মীরা যখন স্টল বাঁধার জন্য যান, তখন হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্যরা তাঁদের পথ আটকান ও বাধা দেন। এমনকি পুলিশ পুরো ঘটনার সময় সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল বলে অভিযোগ তোলা হয়। তবে আইনি লড়াইয়ে সিপিআইএমের বিকল্প প্রস্তাব—নির্দিষ্ট জায়গার কাছাকাছি অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে স্টল বসানোর অনুমতি দেওয়া হোক।
আরও পড়ুনঃ জামিন খারিজ, শ্রীভূমিতে সুজিতহীন পুজো হচ্ছে, যেমন কর্ম তেমন ফল
রাজনৈতিক চাপানউতোর ও উৎসবের আবহাওয়া
পুজোর ঠিক আগে বামেদের লাল মলাটের বইয়ের পসরা বসানো কেন্দ্র করে এই বিরোধ রাজনৈতিক ময়দানকেও গরম করে তুলেছে। ইতিপূর্বেই পুজোয় বুকস্টল এবং ‘শারদোৎসব’ শব্দবন্ধের ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে উঠেছিল। তারওপর উত্তর ২৪ পরগনার দুই গুরুত্বপূর্ণ শহরে দুই বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক সংগঠনের মুখোমুখি অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
এখন বুধবার রাজ্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে কী রিপোর্ট জমা দেওয়া হয় এবং আদালত কী রায় দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বনগাঁ ও নৈহাটির পুজোয় বামেদের সেই চেনা লাল শালু ঘেরা বইয়ের স্টলগুলি শেষ পর্যন্ত বসতে পারবে কি না।


