বাংলার আর পাঁচটা দুর্গাপুজোর জাঁকজমক থেকে এটি একেবারেই আলাদা। এখানে দেবী দুর্গার চালচিত্রের পাশে কিংবা মণ্ডপের ঠিক পাশেই পুজো পান রক্তমাংসের এক ঐতিহাসিক মানবী—যিনি নিজের অসামান্য সাহসিকতা এবং কীর্তির জোরে সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলেন স্বয়ং দেবী। তিনি আর কেউ নন, বাংলার ইতিহাসের কিংবদন্তি ‘দেবী চৌধুরানী’ বা জয়দুর্গা দেবী। জলপাইগুড়ির বেলাকোবার মন্থনী হাটের এই ঐতিহাসিক পুজো ও মেলা ঘিরে প্রতিবারই পুজোয় উন্মাদনা থাকে তুঙ্গে।
আরও পড়ুনঃ বাড়ছে উত্তেজনা, সকালেই আশঙ্কা করেছিলেন; দীপকের বাড়িতে হঠাত্ পুলিশ, তেরঙা মার্চের আগেই গ্রেফতার
ইতিহাসের পাতা থেকে পুজোর উৎস
সময়টা ১৭৭০ থেকে ১৭৭৩ সাল। বাংলার বুকে তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তাদের দেশীয় ইজারাদারদের চরম অত্যাচারে সাধারণ মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। সেই ঘোর দুর্দিনে বৈকুণ্ঠপুরের রাজা দর্পদেব, সন্ন্যাসী নেতা ভবানী পাঠক এবং রংপুরের মন্থনা এস্টেটের বিদূষী মালকিন জয়দুর্গা দেবী একজোট হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন ঐতিহাসিক ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’। শোষকদের ধনসম্পদ লুঠ করে তা গরিব ও বঞ্চিত মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁদের ব্রত। গরিবের এই ত্রাতার সংগ্রামী জীবন থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অমর সৃষ্টি ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাস রচনা করেছিলেন।
জয়দুর্গা দেবীর তিরোধানের পর মন্থনা রাজ্যের সাধারণ প্রজারা তাঁকে ভোলেননি। বরং তাঁর বীরত্ব ও লোককল্যাণমূলক কাজের স্মরণে তাঁর আবক্ষ বা পূর্ণাবয়ব মূর্তি তৈরি করে সুখ-সমৃদ্ধির দেবী হিসেবে পুজো শুরু করেন। বৈকুণ্ঠপুরের রাজা দর্পদেবের আমলেই জলপাইগুড়ি শহর সংলগ্ন রংধামালির কাছে মন্থনী হাটে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সেই সাহসী মানবী কালক্রমে মানুষের ভক্তি ও ভালোবাসায় হয়ে ওঠেন ‘মা মন্থনী’ বা ‘জয়দুর্গা’।
মূর্তির রূপ ও প্রাচীন প্রথা
মন্থনী মায়ের মূর্তিতে কোনো জমিদারি অহংকার, দশটি হাত বা মহিষাসুর বধের দৃশ্য নেই। এখানে তিনি সম্পূর্ণ অন্য রূপে পূজিতা হন:
সাজপোশাক: মা মন্থনী এখানে পরিধান করেন লাল পাড় সাদা শাড়ি।
সিংহাসন ও মুদ্রা: তিনি উপবিষ্ট থাকেন একটি নীল রঙের সিংহাসনে। তাঁর বাঁ হাতে থাকে একটি পবিত্র ফুল এবং ডান হাতটি থাকে ভক্তদের অভয় দেওয়ার জন্য বরাভয় মুদ্রায়।
কালী মন্দির: জয়দুর্গা দেবী এবং তাঁর গুরু ভবানী পাঠক দু’জনেই মা কালীর একনিষ্ঠ উপাসক ছিলেন। সেই ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখেই মন্থনী মন্দিরের ঠিক পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন কালী মন্দির।
আরও পড়ুনঃ বাড়ির দরজায় সমন সাঁটালো কোর্ট; বিপদ বাড়ছে ধ্রুব রাঠির
ষষ্ঠী থেকে নবমী: অনন্য পুজোর আচার ও মেলা
মন্থনী হাটের দুর্গাপুজোয় এক অদ্ভুত ও প্রাচীন নিয়ম মেনে চলা হয়। মহাষষ্ঠী থেকে মহানবমী—এই চার দিন মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমার মূল আরাধনা শুরুর ঠিক আগে, নিয়ম করে মূল মন্দিরে মা মন্থনী বা জয়দুর্গা দেবীর বিশেষ পুজো সম্পন্ন করা হয়। দেবীকে ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় দুধ, সুস্বাদু পায়েস ও খিচুড়ি।
পুজোর ক’দিন এই মন্থনী হাট ও তার আশেপাশের চা-বাগান ঘেরা ৩৩টি গ্রামের মানুষ সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে এক বিশাল উৎসবে মেতে ওঠেন। চা-বাগান পরিবেষ্টিত এই অঞ্চলে আজও মানুষের অগাধ বিশ্বাস, তাঁদের বিপদে-আপদে রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে সবসময় জেগে থাকেন এই ‘মন্থনী মা’।


