বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা:
মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় মধ্য কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে পুজোপ্রার্থীদের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার চরম গাফিলতির অভিযোগে ইতিমধ্যেই কলকাতা পুলিশ ১০ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। শনিবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পাশাপাশি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ঘুরে দেখার পর সাংবাদিক বৈঠকে বড়সড় সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কলকাতা হাইকোর্টের বর্তমান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে মৃতদের পরিবারের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও চাকরির বড় ঘোষণা করা হয়েছে।
কীভাবে ঘটল বিপর্যয়?
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, সপ্তমীর সন্ধ্যায় আনুমানিক ৭টা ৪০ মিনিট নাগাদ হঠাৎই মণ্ডপের ভেতরে মাইকে কিছু একটা ঘোষণা করা হয়। এর পরই দর্শনার্থীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। মণ্ডপ থেকে বেরনোর সংকীর্ণ ও বৃত্তাকার পথ দিয়ে বাইরে আসার সময় একদল মানুষ মাটিতে পড়ে যান এবং তাঁদের ওপর দিয়েই জনস্রোত পার হতে শুরু করে। এর ফলেই পদপিষ্ট হয়ে এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, এই ঘটনায় ১৭ থেকে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ গুরুতর জখম হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা ও পদক্ষেপ
শনিবার রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরে তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন:
1. বিচারপতি ও এসআইটি (SIT) তদন্ত: মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, “এই ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। থিমের চেয়ে মানুষের প্রাণ অনেক বেশি মূল্যবান।” এই দুর্ঘটনার আসল সত্য উদঘাটনে তিনি আগামী দিনেই কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি লিখে অনুরোধ করবেন, যাতে হাইকোর্টের একজন বর্তমান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা হয়।
2. ক্ষতিপূরণ ও সরকারি চাকরি: দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মৃতদের পরিবারপিছু ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য এবং পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া সমস্ত আহতদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করবে রাজ্য সরকার।
3. কড়া বার্তা ও পুজো পরিদর্শন: পুজো উদ্যোক্তাদের সতর্ক করে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যে, জাঁকজমক বা থিমের লোভে মানুষের জীবন বিপন্ন করা চলবে না। এখন থেকে দমকল ও পুলিশ প্রশাসনের পরামর্শ মেনে মণ্ডপসজ্জা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রবিবারই কলকাতার অন্যান্য নামী পুজো মণ্ডপগুলির নিরাপত্তা খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ দল পরিদর্শন করবে।
আরও পড়ুনঃ বই তুলতে বুলডোজার! পতনের দিন কি আসন্ন? বামেদের বই বিপণি বন্ধের চেষ্টা, রাজ্য জুড়ে ‘গেরুয়া তাণ্ডব’
পুলিশের কড়া পদক্ষেপ ও তদন্ত
দুর্ঘটনার পর থেকেই চোরবাগান মণ্ডপটি সম্পূর্ণ ঘিরে রেখেছে পুলিশ। মণ্ডপে পর্যাপ্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল কি না, প্রবেশ ও প্রস্থান পথের ত্রুটি কোথায় ছিল এবং এই গাফিলতির পেছনে ঠিক কাদের হাত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে আটক ১০ জনকে দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে। মহামপ্তমীর এই রক্তক্ষয়ী ও মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পর উৎসবের আনন্দ ফিকে হয়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।


