বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা:
মহাপূজার আনন্দ ও উৎসবের আবহের মাঝেই রাজ্যের একাধিক প্রান্তে চরম রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও উত্তেজনার ছবি সামনে এল। সপ্তমীর সন্ধ্যায় যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ড চত্বর, উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত এবং নাগেরবাজার এলাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠল বামেদের অস্থায়ী বইয়ের স্টল স্থাপন ও তা উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে। একদিকে পুলিশের বুলডোজার নামিয়ে যাদবপুরে সিপিএমের স্টল সরানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে বারাসত ও নাগেরবাজারে বিজেপি ও এবিভিপি কর্মীদের বিরুদ্ধে স্টলে হামলা ও মারধরের গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় দুর্গাপুজোর মরসুমে রাজনৈতিক পারদ চরমে উঠেছে।
যাদবপুরে বুলডোজার নিয়ে পুলিশি তৎপরতা, পথে নামলেন সুজন চক্রবর্তী
শনিবার সন্ধ্যায় যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে সিপিএমের একটি দীর্ঘদিনের পরিচিত অস্থায়ী বইয়ের স্টলকে ঘিরে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ, কোনো রকম লিখিত নোটিস বা আইনি নির্দেশ ছাড়াই পুলিশ আচমকা সেখানে হাজির হয়ে জোর করে স্টলটি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এমনকি স্টল ভাঙার জন্য ঘটনাস্থলে বুলডোজার পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়, যা দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাম কর্মী ও নেতৃত্ব।
খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী এবং রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ সেনগুপ্ত-সহ প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ। প্রশাসনের এই একতরফা পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সুজন চক্রবর্তীরা প্রশ্ন তোলেন যে, কিসের ভিত্তিতে এবং কার নির্দেশে এই বুলডোজার রাজ চালানো হচ্ছে? বুলডোজারের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন বামকর্মী ও সমর্থকরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়।
বারাসত ও নাগেরবাজারে হামলা ও সংঘর্ষ
যাদবপুরের পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সদর বারাসতের কলোনি মোড় এবং চাঁপাডালি মোড়ে সিপিএমের বুকস্টলে ব্যাপক ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের তির বিজেপির দিকে। স্থানীয় সূত্রে খবর, শনিবার সন্ধ্যায় হঠাৎই একদল বিজেপি সমর্থক হাতে ‘হনুমান চালিশা’ নিয়ে ওই স্টলগুলিতে চড়াও হন। স্টলের ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং বইপত্র রাস্তায় ফেলে নষ্ট করে দেওয়া হয়। উপস্থিত লোকজনের হাতে জোর করে হনুমান চালিশা তুলে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম হওয়াহাঙ্গামা বাধলে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
অন্যদিকে, নাগেরবাজার মোড়েও বইয়ের স্টলকে কেন্দ্র করে সিপিএম ও অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) মধ্যে খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। এবিভিপির অভিযোগ, পুজোর মরসুমে এই ধরনের স্টলের আড়ালে দেশবিরোধী প্রচার চালানো হচ্ছে এবং দেবী দুর্গাকে অপমান করা হচ্ছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বচসা ও হাতাহাতি শুরু হয়। সংঘর্ষের জেরে নাগেরবাজার থানার পুলিশ হস্তক্ষেপ করে এবং সিপিএম সদস্য সঞ্জয় দেবনাথকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
পটভূমি ও শাসকদলের অবস্থান
পুজোর দিনগুলিতে বামেদের বুকস্টল করা নিয়ে রাজনৈতিক তরজার সূত্রপাত করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই। তিনি পুজো কমিটিগুলিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, ব্যানারে যদি ‘দুর্গাপুজো’ শব্দের বদলে ‘শারদোৎসব’ লেখা হয়, তবে যেন সেই স্টলগুলি করতে না দেওয়া হয়। এরপর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বামেদের স্টল ভাঙার হিড়িক পড়ে যায় বলে অভিযোগ। সিপিএমের তরফে জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র কলকাতাতেই এ পর্যন্ত অন্তত দশটি জায়গায় তাদের বুকস্টল জোর করে ভেঙে বা গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি শুক্রবার এন্টালির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডেও পুলিশকে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি, উল্টে বিজেপির কর্মীরা স্টল ভেঙে দলের নেতাকর্মীদের মারধর করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে সিপিএম।
মহাসপ্তমীর রাতে সাধারণ মানুষের যখন পুজোর আনন্দে মেতে ওঠার কথা, ঠিক সেই সময়ে বইয়ের স্টল ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজপথ যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠল, তা এক নতুন রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


