বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা:
মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পর থেকেই তীব্র ক্ষোভে ফুটছে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পুজো মণ্ডপের ভেতর বিশৃঙ্খলা শুরু হওয়ার সময় পুলিশ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল এবং পরিস্থিতির অবনতি হতেই তারা ঘটনাস্থল থেকে সরে বা পালিয়ে গিয়েছিল বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এই জনরোষ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ সামনে আসার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবান্ন ও লালবাজারের তরফে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে গিরিশ পার্ক থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক বা ওসি সুমিত কুমার ঘোষকে।
নতুন দায়িত্ব পেলেন হীরক দলপতি
চোরবাগানের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও তদন্তের সুবিধার জন্য গিরিশ পার্ক থানার ওসির দায়িত্ব থেকে সুমিত কুমার ঘোষকে সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। এখন থেকে ওই থানার নতুন দায়িত্ব সামলাবেন হীরক দলপতি। বর্তমানে তিনি কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত রয়েছেন। এবার থেকে গোয়েন্দা বিভাগের নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গিরিশ পার্ক থানার আইনশৃঙ্খলার দেখভালের দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়েছে।
বৃষ্টি, অতিরিক্ত ভিড় ও অব্যবস্থার জের
আবহাওয়ার পূর্বাভাস মতোই সপ্তমীর দিন দুপুর থেকেই কলকাতায় বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল এবং সন্ধ্যার দিকে তা অঝোরে নামতে শুরু করে। ছাতা মাথায় দিয়েও পুজোপ্রেমী মানুষ প্যান্ডেল হপিং চালিয়ে যান। কিন্তু মহাসপ্তমী এবং বৃষ্টির জেরে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এমনিতেই চরম অব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। এর মাঝেই মধ্য কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন মণ্ডপ ঘিরে চলতি বছর সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে তুঙ্গে থাকা উন্মাদনা এবং প্রচারের জেরে সেখানে উপচে পড়া ভিড় হবে, তা বহু আগেই আন্দাজ করা গিয়েছিল।
পুজো উদ্যোক্তারা ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু ব্যবস্থা নিলেও তা মারাত্মকভাবে অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়। শনিবার সন্ধ্যায় প্রবল ভিড়ের চাপে মণ্ডপের একাংশ ভেঙে পড়ে এবং সেখানে প্রায় ৩০ জন মানুষ পদপিষ্ট হন, যার মধ্যে শেষ পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়দের তীব্র ক্ষোভ ও পুলিশের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ
দুর্ঘটনার পর থেকেই পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাঁদের দাবি, মণ্ডপের ভেতরে যখন হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশ কর্মীরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ন্যূনতম চেষ্টা তো দূরে থাক, বরং সাধারণ মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই সেখান থেকে পালিয়ে যান।
পাশাপাশি, মণ্ডপের প্রবেশপথ এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল যাতে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয় এবং বার বার দড়ি বা ব্যারিকেড সরিয়ে ভিড় অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার ফেই এই বিপর্যয় ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠছে।
আরও পড়ুনঃ মর্গের সামনে গাড়ির পর গাড়ি; উৎসবের গেরুয়া শহরে এখন শুধু বিসর্জনের সুর
প্রশাসনের তৎপরতা ও তদন্ত প্রক্রিয়া
চরম এই বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পরেই নবান্ন ও পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ করেছে। অবিলম্বে চোরবাগান সর্বজনীন পুজোর মণ্ডপটি দর্শনার্থীদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গোটা এলাকায় নতুন করে কোনো অশান্তি এড়াতে কঠোরভাবে ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে।
রবিবার সকালেই লালবাজারের উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছে। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের তরফ থেকে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে, যারা বর্তমানে পুরো বিষয়টির গভীরে গিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে।


