বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা:
ঠাকুর দেখা কিংবা অঞ্জলি দেওয়ার আনন্দের দিনগুলি নিমেষেই মুছে গিয়ে তিলোত্তমায় নেমে এসেছে এক অতল শোকের ছায়া। মহাসপ্তমীর রাতে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনায় যাঁদের জীবনদীপ নিভে গেছে, রবিবার সকালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়জনদের মুখগুলি যেন সেই ভয়াবহতারই জীবন্ত দলিল। উৎসবের আলোয় সেজে ওঠা শহরে এখন কেবলই স্বজন হারানোর কান্না আর বিসর্জনের সুর।
আরও পড়ুনঃ সকাল থেকেই থমথমে চোরবাগান; কঠোরভাবে জারি ১৬৩ ধারা
মর্গের সামনে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মৃতদেহবাহী গাড়িগুলির দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন পরিজনেরা। কারোর চোখের জল শুকিয়ে গেছে, কেউ আবার ফুফিয়ে বা চিৎকার করে কেঁদে উঠছেন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই হাসপাতাল এবং মর্গের চত্বরে ছোটাছুটি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়া এই মানুষগুলির কাছে সপ্তমীর এই সকালটা এক চরম অভিশাপের মতো নেমে এসেছে।
নিউটাউনের রিকশাচালক বিনোদ হালদার দুই সন্তানের মধ্যে তাঁর বড় মেয়ে ১৭ বছরের বর্ণালী হালদারকে চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলেছেন। একাদশ শ্রেণির ছাত্রী বর্ণালী বান্ধবীদের সঙ্গে সল্টলেকে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলেও শেষ পর্যন্ত চোরবাগানে চলে আসে। রাতে সেই মর্মান্তিক খবর পাওয়ার পর থেকেই হাসপাতালের মর্গের বাইরে ঠায় বসে রয়েছেন বিনোদবাবু। কাঁপা গলায় তিনি শুধু বললেন, রিকশা চালাতে চালাতেই খবরটা পেয়েছিলাম, আমাদের জীবনে আর কোনো দিন পুজো ফিরে আসবে না, আমার সব শেষ হয়ে গেল।
কুমারটুলির বাসিন্দা সৌরভ মণ্ডল এসেছিলেন তাঁর মা মিঠু মণ্ডলের মৃতদেহ নিতে। সেই ভয়াবহ সন্ধ্যার স্মৃতি রোমন্থন করে সৌরভ জানান, মণ্ডপ থেকে বেরোনোর সময় হঠাৎ প্রচণ্ড হুড়োহুড়ি শুরু হয় এবং তাঁর ওপর কয়েকজন মানুষ এসে পড়ায় তিনি নিচে চাপা পড়ে যান। চোখের সামনে মা ছিটকে দূরে সরে যান। পরে ভিড়ের নিচ থেকে যখন মাকে উদ্ধার করা হয়, তখন সব শেষ। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, দুর্ঘটনার সময় বেরোনোর পথে কোনো পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন না, আর বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল।
বিহারের বাসিন্দা হলেও বিগত বিশ বছর ধরে কলকাতায় বসবাসকারী সুদামা রাউতের পরিবারেও নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। আনন্দনগর কালীতলার বাসিন্দা তাঁর ছোট মেয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী আকৃতি কুমারী বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে আর জীবিত ফিরল না। একই পরিণতি হয়েছে বর্ণালীর বান্ধবী তথা নিউটাউনের ১৭ বছরের কিশোরী তানিয়া বিশ্বাসের। সল্টলেকে যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হওয়া তানিয়াকে তার মা আনন্দের দিনে বাধা দেননি, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই যে কাল হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি পরিবারটি।
আরও পড়ুনঃ টাকা দিয়েই দেখতে হচ্ছিল চোরবাগানের পুজো? দুই রকমের পাস ঘিরে বিতর্ক!
মর্মান্তিক এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার উত্তর যোগেন্দ্রনগরের উনিশ বছরের কলেজপড়ুয়া তরুণী প্রিয়া সমাদ্দারও। বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে এসে ভিড়ের চাপে প্রাণ হারাতে হয়েছে তাঁকে। বর্তমানে হাসপাতালের সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক কাজ সামলাচ্ছেন প্রিয়ারই এক খুড়তুতো দাদা।
সহকর্মী দিলীপ ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী দীপালি ঘোষকে হারিয়ে দিশাহারা মিহিরবরণ জানা। বরাহনগরের বাসিন্দা এই দম্পতি শনিবার সন্ধ্যায় চোরবাগানে ঠাকুর দেখতে এসে আর বাড়ি ফিরে যেতে পারেননি। তাঁদের একমাত্র পুত্র সন্তান এখন মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে বাবা-মায়ের নিথর দেহ গ্রহণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
নদিয়ার চাকদহ থেকে স্ত্রীকে নিয়ে আনন্দ করতে আসা রাম বিশ্বাস নিজে কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও রক্ষা করতে পারেননি তাঁর স্ত্রী আরতি সরকার বিশ্বাসকে। দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, বৃষ্টি নামার পর হঠাৎ দড়ি খুলে দেওয়া হয় এবং হুড়মুড় করে মণ্ডপের ভেতরে অন্ধকার নেমে আসার মাঝেই সকলে ঢুকতে শুরু করে। ধাক্কাধাক্কিতে তাঁরা দুজনেই মাটিতে পড়ে যান। স্ত্রীকে তোলার চেষ্টা করেও ভিড়ের চাপে আর সফল হননি তিনি। চোখের সামনে স্ত্রীর মৃত্যু দেখতে পাওয়ার সেই দৃশ্য এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁকে।
প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অপরিকল্পিত ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং অব্যবস্থার মাশুল হিসেবে এই নিরপরাধ প্রাণগুলির চলে যাওয়া শহরবাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। আনন্দ ও উৎসবের আবহে মোড়ানো পুজো আজ হাজারো পরিবারের কাছে চিরকালের মতো এক গভীর ক্ষত ও কান্নার দিনে পরিণত হলো।


