বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা:
মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় মধ্য কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনায় রবিবার সকালেও থমথমে গোটা এলাকা। এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ, নেপথ্যের পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত গাফিলতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে তদন্ত জোরদার করেছে কলকাতা পুলিশ। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় পুজো কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ম্যানেজার সহ মোট ১৪ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে। মণ্ডপ চত্বরে দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এবং প্রবেশ ও প্রস্থান পথের ত্রুটিগুলি তদন্তের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি ও পুলিশি কড়াকড়ি
উৎসবের মরসুমে এমন নজিরবিহীন প্রাণহানির জেরে সোমবার সকাল থেকেই চোরবাগান ও তার সংলগ্ন রাজপথ জুড়ে নিস্তব্ধতা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং নতুন করে কোনো আইনশৃঙ্খলা সমস্যা বা উত্তেজনার সৃষ্টি না হতে দিতে বউবাজার থানা এলাকার অন্তর্গত ওই পুজো মণ্ডপ ও তার আশপাশের নির্দিষ্ট রাস্তায় কঠোরভাবে ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। পুলিশের তরফে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের কোনো ধরনের জমায়েত বা ভিড় করার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। মণ্ডপ চত্বরটি পুলিশি ঘেরাটোপে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।
মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৯, আজই হস্তান্তর দেহগুলি
ভয়াবহ এই পদপিষ্টের ঘটনায় শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে **১৯ জনে**। এছাড়া অন্তত ২৫ জন গুরুতর আহত ব্যক্তি বর্তমানে কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, আইনগত প্রক্রিয়া এবং ময়নাতদন্তের সম্পূর্ণ কাজ রবিবার সম্পন্ন হওয়ার পর মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মানুষগুলির নিথর দেহ একে একে তাঁদের শোকার্ত পরিজনদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হবে। পুজোর আলোর রোশনাইয়ের মাঝে এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গোটা রাজ্য জুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আরও পড়ুনঃ মেডিক্যাল কলেজে শুধুই আর্তনাদ, পুলিশ ছিল না; ক্ষোভের আগুনে ফুঁসছে গোটা কলকাতা
কীভাবে ঘটেছিল বিপর্যয়? আবহাওয়ার প্রভাব ও করিডোরের ত্রুটি
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন যে ঘটনার দিন আবহাওয়া ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সপ্তমীর দিন সকাল থেকেই কলকাতা ও তার সংলগ্ন এলাকায় দফায় দফায় বৃষ্টি হচ্ছিল। দুপুরের দিকে বৃষ্টির দাপট বাড়লেও পুজোপ্রেমী মানুষের উৎসাহ বা প্যান্ডেল হপিংয়ে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। ছাতা মাথায় দিয়েও দর্শনার্থীরা বিভিন্ন মণ্ডপে ভিড় জমিয়েছিলেন। বিকেলের দিকে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও সন্ধ্যায় ফের মুষলধারে বৃষ্টি নামে। আর ঠিক সেই বৃষ্টির সময়ই চোরবাগান সর্বজনীন মণ্ডপে জনস্রোত উপচে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও প্রাথমিক তথ্যে জানা গিয়েছে, চোরবাগান মণ্ডপে ঢোকার পরেই রয়েছে একটি বিশেষ বৃত্তাকার **‘এলিভেটেড করিডোর’**, যেখান দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে দর্শনার্থীদের বাইরে বেরিয়ে আসতে হতো। এই সংকীর্ণ ও বৃত্তাকার করিডোরের প্রচণ্ড ভিড়ের চাপে একদল মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। একই সঙ্গে প্রবল বৃষ্টির কারণে বাইরে থেকে হুড়মুড়িয়ে মানুষ ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং পদপিষ্টের এই মর্মান্তিক বিপর্যয় ঘটে।


