বিশেষ প্রতিবেদন:
নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এবং তাঁর রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প লোকমুখে বহুল প্রচলিত। কিন্তু রাজবাড়ির অসীম আড়ম্বর ও জাকজমকের মধ্যেও কীভাবে এক গরিব ব্রাহ্মণের ঘরে দেবী দুর্গার অলৌকিক উপস্থিতি উপলব্ধি করেছিলেন রাজা, তা নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে রানাঘাটের ঐতিহ্যবাহী বুড়োমা-র এক রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়কর জনশ্রুতি।
আরও পড়ুনঃ হাড়ে হাড়ে শিক্ষা দিয়েছে চোরবাগান; সতর্কতা প্রশাসন, কলকাতা পুলিশের বিশেষ নজর বিসর্জনে চার ঘাটে
রাজার মনে দেবীর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন এবং স্বপ্নাদেশ:
প্রবাদ রয়েছে, একদা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর নবরত্ন সভার সমস্ত বিদ্বান সভাসদ ও রাজপুরোহিতদের ডেকে আক্ষেপের সুর নিয়ে বলেন, “আমি যে রাজবাড়িতে এত বিশাল আড়ম্বরে প্রতি বছর মায়ের পুজো করছি, কই আমি তো মায়ের আসল উপস্থিতি বা কৃপা উপলব্ধি করতে পারছি না! কীভাবে মায়ের এই অনুভূতি পাওয়া সম্ভব, আপনারা তার উপায় জানান।”
রাজার বাক্য আদেশতুল্য হওয়ায় সমস্ত সভাসদ ও পুরোহিতগণ চিন্তায় পড়ে যান। কীভাবে রাজার এই সংশয় মেটানো সম্ভব, তা নিয়ে জল্পনা চলতে থাকে। ঠিক সেই রাতেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে স্বপ্নে দেখা দেন রানাঘাটের চক্রবর্তী বাড়ির জাগ্রত দেবী বুড়োমা। মা রাজাকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, “তুই যদি সত্যি আমার উপস্থিতি ও কৃপা উপলব্ধি করতে চাস, তবে তোর রাজত্বের ব্রহ্মডাঙায় চলে যা। সেখানে গিয়ে দেখ, কীভাবে এক অত্যন্ত গরিব ব্রাহ্মণ পরিবার অপার ভক্তি ও যাতনায় সযত্নে আমার সেবা-পুজো চালিয়ে যাচ্ছে।”
রানাঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা এবং অহংয়ের আঘাত:
স্বপ্ন দেখার পরদিন ভোরবেলাতেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বজরা চড়ে রানাঘাটের বড়বাজার এলাকায় এসে পৌঁছান। সেখান থেকে পালকি করে সোজা উপস্থিত হন চক্রবর্তী বাড়িতে। প্রথম দর্শনেই দেবী বুড়োমার রূপ দেখে রাজা মন্ত্রমুগ্ধ হন এবং মাকে ভক্তিভরে প্রণাম জানান। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দেবীর প্রতিমা প্রত্যক্ষ করতে থাকেন।
তবে মায়ের সেই শান্ত ও সাধারণ রূপ দেখতে দেখতে হঠাৎই রাজার মনে রাজকীয় অহংকার জেগে ওঠে। তিনি মনে মনে বলে ওঠেন, “আমার এত বিশাল রাজবাড়ির ঐশ্বর্যময়ী রাজরাজেশ্বরী মা, আর এই অতি সাধারণ মা—এঁদের মধ্যে ফারাকটা ঠিক কোথায়?”
এই অহংভাবের বশবর্তী হয়েই পরীক্ষা করার জন্য রাজা নিজের কোমরের তরবারি বের করে দেবী প্রতিমার আঙুলে সামান্য আঘাত করে বসেন। আর ঠিক তখনই ঘটে সেই অলৌকিক ঘটনা। আঘাত পাওয়া মাত্রই প্রতিমার আঙুল থেকে ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করে! মুহূর্তের মধ্যে গোটা মণ্ডপে সপরিবারে দেবীর চালচিত্র কেঁপে ওঠে এবং শূন্যে গর্জে ওঠে দেবীর অলৌকিক বাণী— “তোর এত বড় সাহস! তুই আমাকে পরীক্ষা করিস!”


