শারদোৎসবের সপ্তমীর সন্ধ্যায় আলো ঝলমলে কলকাতা মুহূর্তের মধ্যে এক লহমায় অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল। উত্তর কলকাতার সুপ্রাচীন ও জনবহুল চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজো মণ্ডপে ঘটা এক মর্মান্তিক পদপিষ্টের (Stampede) ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৯ জন সাধারণ মানুষ। যে চোরবাগান মণ্ডপ একসময়ে উপচে পড়া ভিড়ে তিলধারণের জায়গা ছিল না, আজকের দিনে সেই চত্বরটি সম্পূর্ণ খাঁ খাঁ করছে এবং পরিণত হয়েছে এক শোকস্তব্ধ দুর্ঘটনাস্থলে। ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকা পুলিশি নিরাপত্তার চাদরে ঘিরে রাখা হয়েছে, যার ফলে উৎসবের শেষ দিনগুলিতেও চোরবাগান মণ্ডপ আচ্ছন্ন রয়েছে গভীর অন্ধকারে ও বিষাদে।
বিজয়ায় দেবীবরণ বাতিল, অনিশ্চয়তার মুখে প্রতিমা নিরঞ্জন
প্রথা ও নিয়ম মেনে চলতি বছর দশমীর দিনে চোরবাগান মণ্ডপে কোনো দেবীবরণের মতো আনন্দের অনুষ্ঠান পালিত হয়নি। কেবলমাত্র নিয়ম রক্ষার খাতিরে ঘট বিসর্জনটুকু সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে পুজো কমিটির মূল প্রতিমা নিরঞ্জন বা বিসর্জন এখনও সম্পূর্ণ অনিশ্চিত অবস্থায় ঝুল রয়েছে। কবে নাগাদ প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া সম্ভব হবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ বা সময় এখনও পর্যন্ত প্রশাসন বা পুজো কমিটির পক্ষ থেকে স্থির করা যায়নি।
কলকাতা হাইকোর্টের সরাসরি পরামর্শ ও নির্দেশিকা অনুযায়ী গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ (SIT) বর্তমানে এই বিশাল দুর্ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। খুব শীঘ্রই সিট-এর প্রতিনিধিরা স্বয়ং ঘটনাস্থলে এসে পুরো পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবেন এবং তার ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত তদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করবেন। এরপর পুলিশের তরফ থেকে লিখিত ছাড়পত্র বা অনুমতি মিললেই কেবল প্রতিমা নিরঞ্জনের পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে, চোরবাগান সর্বজনীনের এবারের প্রতিমা বিসর্জন পর্বটি সম্পূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়েছে।
সিট-এর তদন্তের পরিধি ও মূল দিকগুলি
গত ১৭ অক্টোবর চোরবাগানের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত কারণ উন্মোচন করাই গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দলের প্রধান দায়িত্ব। এছাড়া পুরো ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঠিক কোন সময়ে, কোন পরিস্থিতিতে এবং মণ্ডপের কোন অংশে এই মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনা ঘটল, মণ্ডপের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার (Capacity) তুলনায় সেদিন অতিরিক্ত বা মাত্রাতিরিক্ত ভিড় জমা হয়েছিল কি না—তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত দল।
পাশাপাশি, দুর্ঘটনার দিন আবহাওয়া খারাপ থাকা বা বৃষ্টির কোনো প্রভাব ছিল কি না, কিংবা মণ্ডপ ভেঙে পড়ার বা এই জাতীয় কোনো মারাত্মক গুজব হঠাৎ ছড়িয়ে পড়েছিল কি না—সেই সমস্ত জল্পনা ও নেপথ্য কারণগুলিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখছে এই কমিটি।
আরও পড়ুনঃ অনুচরদের কুপিয়ে ও মাথায় আঘাত করে হত্যা! নরবলির চাঞ্চল্যকর তথ্য
জিরো টলারেন্সের বার্তা ও নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ
চোরবাগানের এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কাউকেই যে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না, তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য যে বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে, সেখানে স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থে সচেতনভাবে কলকাতা পুলিশ ও কলকাতা পৌরসভাকে (KMC) রাখা হয়নি।


