দেবজিৎ মুখার্জি, কলকাতা:
অসামান্য ব্যক্তিত্বময়ী তিনি। সিনেমার গুরুগম্ভীর সংলাপ পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন অভিব্যক্তির মাধ্যমে। বিনোদনের জগতে পদার্পণ করেছিলেন অনেক অল্প বয়সেই। পারিবারিক সূত্রেই যোগ রুপোলি দুনিয়ায় সঙ্গে। শুরুর দিকে এক অদ্ভুত আকর্ষণ, আবেদন ছিল তাঁর অভিনয় এবং উপস্থিতিতে। তারপর কালের নিয়মে জীবনের এক একটা অধ্যায় পার করেছেন তিনি। হয়েছেন আরও পরিণত, আরও ব্যক্তিত্বময়ী এবং সাবলীল। আর প্রতিবারই তাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়েছে দর্শকমহল। তিনি অপর্ণা সেন। চলচ্চিত্র জগতের হেভিওয়েট নাম। একাধারে তিনি স্টাইল আইকন, দুরন্ত অভিনেত্রী, সাহসী পরিচালক- আর নিন্দুকরা বলেন ‘ঠোঁটকাটা’। সিনেমা হোক বা পর্দার বাইরে অপর্ণা সেনের স্পষ্ট বাংলা এবং ইংরেজি উচ্চারণ, কথা বলার ধরণ, আদব-কায়দা, সাজপোশাক—— সবেতেই ফিদা বাঙালি।
ব্রিয়ান ব্রেক– এর ‘মনসুন‘ সিরিজ – মাত্র ১৫তেই নজর কেড়েছিলেন অপর্ণা
বয়স মাত্র ১৫। আর তখনই নজর কেড়েছিলেন অপর্ণা দাশগুপ্ত। প্রথিতযশা ফিল্ম ক্রিটিক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা চিদানন্দ দাশগুপ্ত এবং জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত কস্টিউম ডিজাইনার সুপ্রিয়া দাশগুপ্তর একমাত্র কন্যা অপর্ণা তখনও ‘সেন’ পদবীর অধিকারিণী হননি। শুরু করেননি অভিনয়ও। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের ফটোগ্রাফার ব্রিয়ান ব্রেক- এর ‘মনসুন’ সিরিজে স্থান পেয়েছিল সদ্য তরুণী অপর্ণার একটি ছবি। এখানেই শেষ নয়। এই ছবি জায়গা করে নিয়েছিল মার্কিন ম্যাগাজিন ‘লাইফ’- এর কভারে। এরপরেই অপর্ণা নজরে আসেন সত্যজিৎ রায়ের। ছায়াছবির দুনিয়ায় অভিষেক হয় তাঁর। ‘তিন কন্যা’ ছবিতে মৃন্ময়ীর চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। সেটাই ছবি শুরু। তারপর একের পর এক হিট ছবি। কোনওটায় ক্লাস, কোনওটায় মাস- দর্শকরা বারবার অপর্ণা সেনকে পর্দায় দেখে বিস্মিত হয়েছেন। কোনওদিনই প্রথাগত ছাঁচে ফেলা ছকে বাঁধা অভিনয় করেননি তিনি। চরিত্র যখন যেরকম, সেই অনুসারে সাবলীল তিনি। সেই অর্থে কমার্শিয়াল ছবির নায়িকা না হলেও, ‘মাস’- এর জন্য যে সিনেমা করেননি তেমনটাও নয়।
আরও পড়ুনঃ পরমাসুন্দরী চতুর্ভুজা, আদ্যাশক্তি মহামায়া, জগতের ধারক; তবে দেবীর পায়ের নিচে কাটা হাতির মুণ্ড কেন?
পারমিতার একদিন – শাশুড়ি–বউমা বন্ধুও হতে পারে, বুঝিয়েছিলেন অপর্ণাই
অপর্ণা সেনের সব ছবি নিয়ে আলোচনা হবে একদিকে। আর ‘পারমিতার একদিন’ থাকবে অন্যদিকে। শুধু দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে নয় এই ছবিতে সাহসী পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন একটি চরিত্র সিনেমার গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হতে পারে- এই ভাবনা বাঙালি মননে জাগিয়েছিলেন অপর্ণা। শুধু তাই নয়- বাঙালি সমাজ শাশুড়ি-বউমার সম্পর্ক বলতে যে দ্বন্দ্ব এবং কলহ বোঝে, সেই ছাপোষা ধ্যানধারনা থেকে বেরিয়ে সনকা এবং পারমিতার সুস্পষ্ট বোঝাপড়া, সম্পর্কের বাঁধন, কোথাও বা বন্ধুত্বের সম্পর্ক সিলভার স্ক্রিনে দেখিয়েছিলেন অপর্ণা সেনই। অপর্ণা সেনের ফিল্ম কেরিয়ারে মাইলস্টোন তৈরি করার মতো অসংখ্য ছবি রয়েছে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ‘পারমিতার একদিন’ বঙ্গজীবনে এক আলাদা ছাপ রেখেছে নিঃসন্দেহে। রিলিজের ২৩ বছর পরেও তাই হয়তো এই সিনেমা একইভাবে প্রাসঙ্গিক।
উনিশে এপ্রিল – অদিতির মায়ের চরিত্রে আপনিই ‘পারফেক্ট‘ ম্যাডাম
ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে তাঁর রীনাদির সম্পর্ক ঠিক কেমন তা নিয়ে আলোচনা ধৃষ্টতা সাধারণ মানুষের না থাকাই শ্রেয়। তবে তাঁদের বন্ডিং, ইকুয়েশন কতটা দৃঢ় তা বোঝা গিয়েছে উনিশে এপ্রিলের প্রতিটি দৃশ্যে। অপর্ণা সেনের থেকেও এই সিনেমা অনেক বেশি দেবশ্রী রায়ের। কিন্তু মা-মেয়ের সম্পর্কের পারদ কীভাবে ওঠানামা করে, তা বোঝাতে নিশ্চিত ভাবেই অদিতির (দেবশ্রী রায়ের চরিত্র) বিপরীতে মায়ের চরিত্রে অপর্ণা সেনকেই প্রয়োজন ছিল। এই ছবিতে অভিনয়, অভিব্যক্তি ছাড়াও মুগ্ধ হওয়া যায় অপর্ণা সেনের সাজসজ্জায়। পরিপাটি শাড়ি, মাথার খোঁপায় ফুলের মালা, নিখুঁত মেকআপ- ওই সাজ যে কত বাঙালি নারী পরবর্তীতে সেজেছেন তা হাতেগুনে বলার বিষয়ই নয়।
আরও পড়ুনঃ যাদবপুরে ২০ হাজার ‘ভূতুড়ে’ ভোটার! সিপিএমের নিশানায় তৃণমূল-বিজেপি
অন্তহীন – সম্পর্কের সমীকরণে ‘অ্যাবসেন্স‘ কতটা জরুরি – সংলাপ বলার ধরনে বুঝিয়েছেন সেই অপর্ণাই
‘দূরত্ব ব্যাপারটা খুব ইমপরট্যান্ট জানিস তো? মানে সামটাইমস অ্যাবসেন্স ইজ রিকোয়ার্ড টু ফিল এ পার্সন‘স প্রেজেন্স ইন্টেন্সলি‘
প্রবাদ আছে ‘অগর ইশক করনা হো তো টুটকে করো’। আর সেই ইশক, মোহব্বতের দুনিয়ায় ‘অন্তহীন’ ছবির এই সংলাপ যে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কেবল তাঁরাই বুঝবেন যাঁরা সেই প্রেমের অনুভূতির আস্বাদ পেয়েছেন। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল সিনেমার সংলাপ যে রূঢ় বাস্তব জীবনেও প্রযোজ্য, ‘অন্তহীন’- এর এই সংলাপকে সেই বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছেন অভিনেত্রী অপর্ণা সেন। তাঁর ম্যানারিজম, সংলাপ বলার ধরন, আবেগ ছোঁয়া উচ্চারণ, অভিব্যক্তি, কফির কাপ ধরার স্টাইল – সবটাই খুব একান্ত, খুব আপন। নিঃসন্দেহে আপনাকে আরও একবার আপনার প্রিয় মানুষটির প্রেমে পড়াবে। দু’মিনিট থমকে একটু ভাবতে শেখাবে। আর এখানেই অপর্ণার মাহাত্ম্য। সংলাপকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন তিনি। সহজভাবে বুঝিয়ে দেন আমার, আপনার সকলের জীবনে চলচ্চিত্রেরও প্রভাব রয়েছে।
অপর্ণা সেন মানেই কি শুধু ‘সো কলড ক্লাসি সিনেমা‘…
নাহ, রীনাদি মানে নিখাদ হাস্যরসবোধও বটে। আর এর জন্য ‘বসন্ত বিলাপ’- এর উদাহরণটুকুই যথেষ্ট। ‘আমি মিস ক্যালকাটা / চাই না দিতে টিপস’ কিংবা’ এক চড়েতেই ঠান্ডা / ধেড়ে খোকাদের পাণ্ডা’ – মেসবাড়ির ছেলেদের সঙ্গে কোমর বেঁধে ঝগড়া, খুনসুটি, মজার ছলে দাওয়াই দেওয়া, অপর্ণা সেন সবেতেই সাবলীল। আর রোম্যান্সেও তিনি ১০০ তে ১০০। আসলে দর্শককে বারবার অভিনেত্রী বুঝিয়েছেন যেকোনও সম্পর্কের বাঁধন, সমীকরণ। রুপোলি পর্দায় বিভিন্ন ধরনের ‘রিলেশনশিপ’- এর সূক্ষ্ম ইকুয়েশনগুলোকে বরাবর বাস্তবায়ন করেছেন অপর্ণা। সেখানেই তাঁর অভিনয় দক্ষতা, অভিব্যক্তির সার্থকতা। তাই অপর্ণা সেন মানে শুধুই ‘১৫ পার্ক এভিনিউ’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’, ‘জাপানিজ ওয়াইফ’, ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ নয়… আমার, আপনার রোজনামচাতেও কোথাও না কোথাও সূক্ষ্মভাবে জড়িয়ে রয়েছেন রীনাদি। আসলে আমরা সকলেই হয়তো মনে মনে ছক ভাঙতে চাই। হয়তো সুযোগ পাই না। আর বরাবরই ছকভাঙা সম্পর্কের সমীকরণকে পর্দায় প্রাণ দিয়েছেন অপর্ণা। আর তাই বোধহয় ব্যক্তিত্ব, স্টাইল, উপস্থিতি সবেতেই ভীষণ ‘পলিশড’ হওয়ার পরেও একজন মধ্যবিত্ত, ছাপোষা বাঙালির জীবনে অপর্ণা সেন হয়ে উঠেছেন ‘প্রিয় রীনাদি’।









