“নিজের মনটাকে অন্ধকার হতে দিও না ফেলু”।
পর্দায় বলেছিলেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়- জন্মসূত্রে সরোজিনী নাইডুর ভাই। হরি আর ইন্দ্র-র অসামান্য এই মেলবন্ধন তবু মুখে মুখে কেমন করে হারীন্দ্র হয়ে গেল কে জানে? বড়দি আজন্ম কংগ্রেসি আর দাদা বীরেন্দ্র জার্মান কম্যুউনিস্ট পার্টির সদস্য। এমন এক অদ্ভুত পরিবারে জন্ম তার।
আরও পড়ুনঃ ‘অত্যন্ত নিন্দনীয়’, কালিয়াচকের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট
মহাত্মা গান্ধীজির ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে গান লিখলেন “শুরু হুই জঙ্গ হামার”। ইংরেজ শাসক ভালভাবে নিল না ব্যাপারটা। তবু মাথা নোয়ালেন না হরীন্দ্র। বিয়ে করলেন বাল্য বিধবা কৃষ্ণা রাওকে। অন্যদিকে তখন প্রকাশিত হয়েছে তার প্রথম ইংরেজি কবিতার বই ‘The Feast of youth’, যার ভূমিকা লিখেছিলেন বিখ্যাত অ্যাংলো-আইরিশ কবি নাট্যকার সমালোচক জেমস হেনরি কাজিনস। যে বই পড়ে লরেন্স বিনিয়ন লিখেছিলেন ‘He has drunk from the same fount as Shelley and Keats.’ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক কুইলার কাউচ চমকে গেছিলেন নতুন কবির প্রতিভায়। বিস্ময় গোপন না করে বলেই ফেলেন ‘We would have given Shelley and Keats a chance. Why not this young poet?’ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর “দ্য ফ্লুট” কবিতা পড়ে তা অনুবাদের ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন।
ধীরে ধীরে ঝুঁকছিলেন বামপন্থায়। যোগাযোগ রাখছিলেন গণনাট্য সংঘের সঙ্গে। হিন্দিতে দ্য ইন্টারন্যাশনাল- গানের অনুবাদ যে তারই সেটাই বা কজন জানি? যেমন জানি না রেডিওতে গাওয়া তাঁর গান “রেলগাড়ি” ফিল্মে গেয়েই তো নাম কুড়ালেন “গায়ক” অশোক কুমার। ‘সূর্য অস্ত্ হো গয়া/ গগন মস্ত্ হো গয়া’, ‘তরুণ অরুণ সে রঞ্জিত ধরণী’-র মতো গান লিখছেন একের পর এক। গেয়েছেন উদাত্ত গলায়।
কিন্তু চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে তুঙ্গস্পর্শী উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। ১৯৬৩ সালে মার্চেন্ট আইভরি প্রোডাকশানের প্রথম ছবি ‘দ্য হাউজ়হোল্ডার’-এ অভিনয় করলেন হরীন্দ্রনাথ। সে ছবি তৈরিতে সাহায্য করছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেখানেই হরীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আলাপ। মুগ্ধ সত্যজিৎ ঠিক করলেন এমন অভিনেতাকে দিয়ে কাজ না করালেই নয়। গুগাবাবা-তে বরফির ভূমিকায় এলেন হরীন্দ্র।একটিও কথা নেই। তবু কি সাবলীল তাঁর অভিনয়। ডায়লগ বলতে-
ব্রররররর গুররররর ফিঁইইশশশশশ,
নিরুউউউশশশশ,
গুররররর গুশশশশ,
ফিমুশশশশ উশশশশ ভুশশশশ,
হিঁউশশশশ ভুশশশশ মুশশশশশ…
সঙ্গে সরু লাঠি মাটিতে ঠুকে খোঁচা খোঁচা দাঁত বের করে খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দে হাসি। মাথার আজব মুকুট থেকে দুই সরু অ্যান্টেনা বেয়ে মুখের সামনে টুং টুং করে দুলছে দুখানা রুপোলি বল। সাহেব, বিবি গোলামের ঘড়িবাবু, বাবুর্চি-র দাদুজি কিংবা সীমাবদ্ধ- র স্যর বরেণ রায়। সবেতেই তিনি সমান সচ্ছন্দ। মাস্টার স্ট্রোকটা দিলেন সত্যজিৎ রায়- তাঁকে সিধু জ্যাঠা বানিয়ে।
আরও পড়ুনঃ প্রতিবাদের নামে বিচারকদের হেনস্থা, চুরান্ত অসভ্যতা; রিপোর্ট তলব কমিশনের, অবহিত করা হল হাই কোর্টকেও
১৯৭৪ সালে সোনার কেল্লা, তাঁর অভিনীত শেষ বাংলা সিনেমা। কয়েক মিনিটের রোল। আর তাতেই তিনি অমর। হরীন্দ্রনাথের জন্য এর চেয়ে ভাল পরিনতি আর কীই বা হতে পারত? সত্যিই তো! আর কি বিশেষণে ভূষিত করবেন এই স্বাধীনতা সংগ্রামী, কবি, গায়ক, আবৃত্তিকার, চিত্রকর, অভিনেতা, গীতিকার, প্রযোজক, গবেষককে।
তাই সবকিছু মিলেমিশে চিরন্তন সিধুজ্যাঠা হয়ে থেকে যান হরীন্দ্রনাথ। আজ, জন্মদিনে সিধুজ্যাঠাকে বঙ্গবার্তা-র প্রণাম।



