কোচবিহারের শীতলকুচিতে নিহত সিপিআই(এম) কর্মী মন্টু মিঞার পরিবারের সাথে দেখা করতে গিয়ে বিজেপির আক্রমণের শিকার হলেন মীনাক্ষী মুখার্জি। মঙ্গলবার মীনাক্ষী মুখার্জি, অলোকেশ দাস, অনন্ত রায় সহ সিপিআই(এম) নেতৃত্ব যান মন্টু মিঞার পরিবারের সাথে দেখা করতে। যাওয়ার পথে তাদের রাস্তা আটকায় বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতিরা। গাড়ি লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয় ডিম। বিক্ষোভ দেখানো হয় মীনাক্ষী মুখার্জিকে ঘিরে। যখন এই ঘটনা ঘটছে তখন সেখানে উপস্থিত ছিল পুলিশ। বিজেপির কর্মীদের কোন বাধা দেওয়া হয়নি পুলিশের পক্ষ থেকে।

মীনাক্ষী মুখার্জির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘গোরক্ষার নাম করে আমাদের কমরেডকে খুন করেছে বিজেপির গুন্ডারা। আমরা তার পরিবারের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলাম। পুলিশের সামনে আমাদের গাড়ির ওপর আক্রমণ করা হয়। পুলিশ তাদের কোন বাধা দেয়নি। যারা এই ঘটনার সাথে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধের প্রশাসনকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইসির বিরুদ্ধেও অভিযোগ জানানো হবে।’
আরও পড়ুনঃ বাঙালির মাথা হেঁট করলেন শীতলকুচির বিজেপি কর্মীরা! সাহসীকতার পরিচয় দিলেন CPI(M)-এর ক্যাপ্টেন মীনাক্ষী
শুধু মন্টু মিঞা নয় মুম্বাইয়ে কাজ করতে মৃত্যু হয়েছে ওই গ্রামের এক যুবকের। যাদের সাথে সে কাজ গিয়েছিল তাদের সাথে পরিবার যোগাযোগ করতে পারছে না। পুলিশের পক্ষ থেকেও দেহ ফিরিয়ে আনার জন্য কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এদিন ওই পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবারের সাথেও দেখা করার কথা নেতৃত্বের।
রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পর গোরক্ষকদের হামলায় প্রথম শহীদ মন্টু মিঞা সিপিআই(এম)’র কর্মী ছিলেন। নির্বাচনের সময়েও তিনি সক্রিয়ভাবে পার্টির কাজ করেছেন। বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের দু’মাস পর গত শনিবারই প্রথম শীতলকুচির গোসাইয়ের হাটে গোরুর কেনাবেচা শুরু হয়। এখানেই গোরু কেনেন পাঠানটুলি গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব মিঞা। তাঁর কেনা গোরুটি বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই শনিবার গোরু নিয়ে পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছিলেন মন্টু মিঞা। গোরু কেনার পর সেই গোরু ক্রেতার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে সামান্য উপার্জন করতেন তিনি, রাখাল হিসাবেই পরিচিত ছিলেন। তিনি গোরু নিয়ে রওনা দেওয়ার সময়ই সম্ভবত আততায়ীরা তার পিছু নিয়েছিল। পরে রবিবার সকালে তাঁর ক্ষতবিক্ষত অ্যাসিডে পোড়া মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে।
মাঝবয়সী মন্টু মিঞা শীতলকুচির গোলেনাওহাটির স্থায়ী বাসিন্দা হলেও বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন। সোমবার সকালে খুন হয়ে যাওয়া মন্টু মিঞার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গোটা পরিবার শোকস্তব্ধ হয়ে আছে। প্রত্যেকেই ভীতসন্ত্রস্ত। মৃতের স্ত্রী আসেদা খাতুন বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তার মধ্যেই তিনি জানান, ‘‘শনিবার ভোরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় উনি বলে গিয়েছিলেন, রাতে বাড়িতে ফিরে মেয়েকে নিয়ে একসঙ্গে খাবেন। রাতে বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সবাই তাঁকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। ৭ বছরের মেয়ে রিয়াকে সঙ্গে নিয়ে আমিও প্রায় সারা রাত আশপাশের রাস্তায় স্বামীকে খুঁজেছি। বাড়ি থেকে এত দূরে স্বামীর মৃতদেহ পাওয়া যাবে, এটা কল্পনাও করতে পারিনি।’’
আরও পড়ুনঃ বারুইপুর গিয়ে পুলিশকে ৭২ ঘণ্টার ডেডলাইন মুখ্যমন্ত্রীর
এদিকে মীনাক্ষী মুখপাধ্যায়ের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে ও বারুইপুর কাণ্ডের প্রতিবাদে আজসন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরের রামদুলাল সরকার স্ট্রিট থেকে সিপিআইএম শ্যামপুকুর – ২ এরিয়া কমিটির পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। সাধারণ মানুষ ও পার্টি কর্মীরা ছাড়াও এই মিছিলে পা মেলাতে দেখা যায় তাপস প্রামাণিক , জয়ন্ত চ্যাটার্জি, অরূপ অধিকারী , শ্রমিক নেতা অসিত রায়কে।

বিষয়টি কি জনরোষ তৃণমূলের উপর? যদি তাই হয় তাহলে কেন ক্ষোভের মুখে মীনাক্ষী? একগুচ্ছ প্রশ্ন নিয়ে বঙ্গবার্তা যোগাযোগ করেছিল এসএফআই এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য্যর সঙ্গে। কী বলছেন সৃজন?
সৃজনের বক্তব্য, ‘মীনাক্ষীদির সঙ্গে যেটা হয়েছে অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে।’তারপরেই কার্যত একহাত নেন গেরুয়ায় শিবিরকে। বাম নেতা বলেন, ‘বিজেপি দেশের সংবিধান, আইন কানুন এগুলো মানে না। ফলে, তারা যখন যেখানে ক্ষমতায় থাকে, শুধু যে তারা সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে তাই নয়, তার সাথে সাথেই হিটলারের ব্ল্যাক শার্টদের মতো একটা গুণ্ডা বাহিনী, আইন বহির্ভূত গুণ্ডা বাহিনী তারা তৈরি করে। যে গুন্ডা বাহিনীর কাজ হচ্ছে কখনো গো-রক্ষার নামে নামে মানুষ খুন করা। কখনো ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে পার্কে ঢুকে ভাঙচুর করা, কখনো মসজিদ বা চার্চ ভাঙতে চলে যাওয়া, কখনো কোনও লোকের বাড়িতে চলে যাওয়া, তুমি ফেসবুকে কী লিখেছো, কেন লিখেছ বলা নিয়ে। তারই এক্সটেনশন হচ্ছে এই বাহিনীটাকে এখন বিজেপি আনলিশ করে দিয়েছে, বাজারে ছেড়ে দিয়েছে ডিম ছোড়ার জন্য।’
সৃজনের অভিযোগ, এই ডিম ছোড়ার ঘটনা কেবল তৃণমূলের ওপর মানুষের জনরোষ বলে যে বিজেপি চালিয়ে দিতে চাইছে, তা আসলে স্রেফ অজুহাত। বাম নেতা বলছেন, ‘এটা আসলে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে আসলে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত বিরুদ্ধ মত, সমস্ত মানুষ যাঁরা, বিজেপির বাইরে গিয়ে অন্যভাবে ভাবতে চান, তাঁদেরকে দমন করার চেষ্টা হবে। এবং সেটাই চালু হচ্ছে। গুণ্ডা দমন আইন থেকে এই গণতন্ত্র, গণপিটুনি কালচার এবং এখান থেকে মুক্তির জন্য মানুষকে একজোট হতে হবে। আমরা বামপন্থীরা এতে ভয় পাব না।’

একইসঙ্গে ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন বাম নেতা। বলছেন, ‘শুভেন্দু অধিকারীর সাহস থাকলে, আজকে যাঁরা সম্পূর্ণ বিনা কারণে মিনাক্ষী মুখার্জীর গাড়িতে আক্রমণ করলেন, তাঁদের আটক করুন। তবে বুঝব গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটা পশ্চিমবঙ্গে জীবিত আছে।’
তাঁর অভিযোগ, মন্টু মিঞার মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে খুনের অভিযোগ করা হলেও পুলিশ তা গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি এবং অভিযোগও নেয়নি। তিনি বলেন, শুধুমাত্র শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলেন, কিন্তু ফেরার পথে তাঁকে হেনস্থার মুখে পড়তে হয়েছে। মীনাক্ষী বারবার গ্রেপ্তারির দাবি তোলার সঙ্গেই প্রশ্ন তুলতেও শোনা যায়, ‘আমার অপরাধ কী?’


