আশির দশক। বাংলার বুকে তখন লাল দুর্গের জয়জয়কার। সেই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ কলকাতার অলিতে-গলিতে একটি তরুণের জোরালো কণ্ঠস্বর চেনা চেনা লাগছিল সবার। সেই তরুণ আর কেউ নন, মদন মিত্র। ভবানীপুর, আশুতোষ কলেজ থেকে যে লড়াইয়ের শুরু, তা ধীরে ধীরে এক নতুন ইতিহাসের জন্ম দিচ্ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী হিসেবে তাঁর এই পথচলা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বহমান।
আরও পড়ুনঃ বিবাদমান দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র; তৃণমূল ভবনের তালা খুলে ফেলল মালিকপক্ষ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন যুব কংগ্রেসের নেত্রী হিসেবে রাজপথে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালাচ্ছেন, মদন মিত্র তখন তাঁর অন্যতম প্রধান সেনাপতি। হাজরা মোড় থেকে ধর্মতলা—শাসকদলের রক্তচক্ষু আর পুলিশের লাঠি উপেক্ষা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিটি আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকতেন মদন। প্রিয় ‘দিদি’র জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত এই লড়াকু ছাত্র-নেতা তখনই নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন এক অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে।
১৯৯৮ সালের ১লা জানুয়ারি। বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের সূচনা হলো, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক লড়াইয়ের সেই মহাসন্ধিক্ষণে যাঁরা নিজেদের সর্বস্ব বাজি রেখেছিলেন, মদন মিত্র তাঁদের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। নতুন দল গড়ার সেই দিনগুলো ছিল চরম অনিশ্চয়তা ও সংঘর্ষে ভরা। কিন্তু দিদির প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর আনুগত্যের জোরে মদন মিত্র হয়ে উঠলেন তৃণমূলের অন্যতম বিশ্বস্ত ও প্রাচীন লেফটেন্যান্ট।
রাজনীতির চড়াই-উতরাইয়ে মদন মিত্রের জীবনে এসেছে চরম বিপর্যয়। সারদা কাণ্ডে জড়িয়ে গ্রেপ্তার হওয়া, মাসের পর মাস কারাবাস এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির বারবার ম্যারাথন জেরা, শারীরিক ও মানসিকভাবে তাঁকে ভেঙে ফেলার কোনো চেষ্টাই বাকি রাখা হয়নি। একদিকে যেমন আইন ও প্রশাসনের কোপ, অন্যদিকে তেমনই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে চলেছে অন্তহীন ও নিষ্ঠুর ট্রোলিং।
কখনও তাঁর ‘রঙিন’ জীবনধারা, কখনও তাঁর মন্তব্য নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঝড় উঠেছে। কিন্তু সমস্ত অপমান, যন্ত্রণা আর পেনাল্টি হাসি-মুখে সহ্য করেও তিনি দিদির প্রতি তাঁর আনুগত্য থেকে এক চুলও নড়েননি। বহুজন দলবদল করলেও, মদন মিত্র বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছেন তাঁর নেত্রীর পাশে।
সব হারিয়েও কামারহাটির বিধায়ক বারবার প্রমাণ করেছেন যে, তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক আবেগী ও অতন্দ্র প্রহরী। সমস্ত ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে আজও তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় নেত্রীর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা।
আরও পড়ুনঃ বিপদে হাত ছাড়তে ‘ওস্তাদ’ তৃণমূল! সুপরিকল্পিত ‘বিশ্বাসঘাতকতা’
”দিদি আমার শেষ কথা, দিদি আমার ভগবান।” — মদন মিত্র
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও, যখনই দল কোনো সংকটে পড়ে বা নেত্রীর ওপর কোনো আঘাত আসে, চার দশক আগের সেই আশুতোষ কলেজের লড়াকু ছেলেই যেন আবার গর্জে ওঠে। দলগত কোনো ক্ষোভ বা অভিমান থাকলেও, দিদির প্রশ্নে তিনি আজও আপসহীন, বাংলার রাজনীতির অন্যতম রঙিন এবং সবচেয়ে অনুগত সৈনিক।


