ফের সোমেই রেকর্ড পতন শেয়ার বাজারে। প্রি-ট্রেডিং সেশন থেকেই ধাপে ধাপে নামছিল গ্রাফ। বেল বাজতেই এক ধাক্কায় ভারতীয় শেয়ার বাজার উস্কে দিল ‘Black Monday’-র স্মৃতি। মধ্য়প্রাচ্যের যুদ্ধকে সামনে রেখে পরপর দু’সপ্তাহ শেয়ার বাজারের ট্রেন্ড একেবারে একই রকম। সপ্তাহের শুরুতেই অস্বাভাবিক ভাবে পতন। তার পর সারা সপ্তাহ সেই ক্ষতে চলে প্রলেপ। কিন্তু নিরাময় হয় না যন্ত্রণার। চলতি সপ্তাহের বাকি ট্রেডিং-ডে গুলিতেও কি তা হলে একই পরিস্থিতি তৈরি হবে?
সোমবার ৯টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৭৭ হাজার পয়েন্টের নীচে নেমে গিয়েছে সেনসেক্স। সূচক পড়েছে ২ হাজার ৩০০ পয়েন্টেরও বেশি। ৯ মাস পর এতটা বড় পতনের সাক্ষী বিনিয়োগকারীরা। এক ধাক্কায় সেনসেক্স নেমে এসেছে ৭৬ হাজার ৬০৮-এ। একই অবস্থা নিফটি-৫০রও, ২.৯ শতাংশ পড়ে নিফটির সূচক নেমে এসেছে ২৩ হাজার ৭৪৩ পয়েন্টের নীচে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য়ে চলা সংঘাত পরিস্থিতির দশম তম দিনেই কেন অস্বাভাবিক মাত্রায় পতন শেয়ার বাজারের? ওয়াকিবহাল মহল বলছে, তেল সংকট তৈরি করেছে ভয়। বিশ্ববাজারে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। তার মধ্য়ে গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়েছে অপরিশোধিত তেলের ব্যারল প্রতি মূল্যবৃদ্ধি।
আরও পড়ুনঃ CPM-এর কালো পতাকা, TMC-র ‘GO Back’; শান্ত মেজাজেই জ্ঞানেশ
এদিন বিশ্ববাজারে এক ধাক্কায় অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশ। ব্যারল প্রতি দাম পৌঁছে গিয়েছে ১১৭ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যা দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার ৬০০ টাকা। এই পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি বাজারেও ভালো মাত্রায় প্রভাব পড়তে চলেছে বলে মত একাংশের। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের খেসারত দিতে হতে পারে আমজনতাকেই। চ্য়ালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে নয়াদিল্লিকেও।
অপরিশোধিত তেলের ব্যারলের দাম বৃদ্ধি ঘিরে রক্তাক্ত হয়েছে শেয়ার বাজার। জ্বালানি নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হতেই, আতঙ্ক ছড়িয়েছে জ্বালানি ভিত্তিক সংস্থায় বিনিয়োগকারীদের মধ্য়েও। অপরিশোধিত তেলকে ঘিরে যে সকল সংস্থার ব্যবসা যেমন, HPCL, BPCL, IOC, Savita Oil, GAIL — সোমবার বাজার খুলতেই এক ধাক্কায় পড়েছে এই সকল শেয়ারগুলির দাম। খোদ IOC পড়েছে ৬.৬৭ শতাংশ। HPCL পড়েছে ৭.৭৫ শতাংশ। তবে জ্বালানির বাজার যে শুধু তেলের উপরেই নির্ভরশীল, এমনটা নয়। তৈল সংকট দেখা দিতেই বিকল্প জ্বালানি হিসাবে কয়লা, তাপবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রের সংস্থাগুলির শেয়ারে এসেছে গতি।
সোমবার সকালে শেয়ার বাজার খুলতেই ধস নামল। আরবদুনিয়ার সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই পতন! এর ফলে মাত্র পাঁচ সেকেন্ডেই বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৯ লক্ষ কোটি টাকা উধাও হয়ে যায়। যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়ায় বাজারেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বড় ধস নেমেছে প্রধান সূচকগুলিতে। সোমবার সকাল ৯টা ২৮ মিনিটে সেনসেক্স (S&P BSE Sensex) ২ হাজার ৪৪৪.৫১ পয়েন্ট পড়ে ৭৬ হাজার ৪৭৪.৩৯-এ নেমে আসে (Sensex falls 2200 points)। অন্যদিকে নিফটি ৫০ (Nifty 50) ৭২৯.৯০ পয়েন্ট কমে ২৩ হাজার ৭২০.৫৫-এ দাঁড়ায়। এক পর্যায়ে নিফটি ৫০০ পয়েন্টেরও বেশি নীচে নেমে যায়।
বাজারে এই ধস হঠাৎ করে হয়নি। এর আগের ট্রেডিং দিনেও বাজারের পরিস্থিতি খুব একটা ভাল ছিল না। শুক্রবার সেনসেক্স প্রায় ১ হাজার ৯৭ পয়েন্ট কমে ৭৮ হাজার ৯১৮-এ বন্ধ হয়। একই দিনে নিফটি ৩১৫ পয়েন্ট পড়ে ২৪ হাজার ৪৫০-এ লেনদেন শেষ করে।
সামরিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। যুদ্ধের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৭ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি মুদ্রাস্ফীতির উপর পড়ে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে। ফলে শুধু শেয়ারবাজারই নয়, সাধারণ মানুষের খরচের উপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু ভারতেই নয়, এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও। বিভিন্ন এশীয় সূচকেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে, কোথাও কোথাও প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত ধস নেমেছে।
আরও পড়ুনঃ একজন ‘Gen-Z Influencer’ প্রধানমন্ত্রী নেপালের রাজনীতিকে বদলাতে পারবেন?
ইরান-ইজরায়েল সংঘাত গোটা বিশ্বের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, তার আঁচ গিয়ে পড়ছে বিশ্বের তেলবাজারে। এরমধ্যেই রবিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেল। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম আবার তেলের দাম এতটা বেড়ে গেল।
রবিবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক Brent crude নিউইয়র্কে সন্ধ্যার দিকে ব্যারেলপিছু ১০৪ ডলারেরও বেশি দামে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে আমেরিকার প্রধান সূচক West Texas Intermediate-এর দামও ১০০ ডলার পেরিয়ে প্রায় ১০৮ ডলারে উঠে যায়।
গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ১২.৬ শতাংশ বেড়ে ১০৪ ডলারে পৌঁছায়, আর ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে যায়। গত সপ্তাহেই মার্কিন ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ১৯৮৩ সালে তেলের ফিউচার ট্রেডিং শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক বৃদ্ধি বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আরবদুনিয়ার সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে তেল উৎপাদন ও পরিবহণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। কুয়েত, যা OPEC-এর পঞ্চম বৃহত্তম উৎপাদক দেশ, ইতিমধ্যেই সতর্কতামূলকভাবে তেল উৎপাদন ও রিফাইনারির কাজ কমাতে শুরু করেছে। কুয়েত জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের হুমকির কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।









