রাজ্যের শেষ বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যেদিন প্রয়াত হলেন অজস্র মানুষের দু’চোখ দিয়ে দু- ফঁটো চোখের জল পড়ছে। মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগোক্তির মত বলেছেন রাজনৈতিক নেতাদের জীবন – যাপন কেমন হতে পারে তাঁর একটি আদর্শ ছবি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দেখিয়ে গিয়েছেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তখন তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীতা করার সামান্য সুযোগ বিরোধীরা ছাড়েন নি।
খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয় সেই ধুন্দুমার রাজনৈতিক আবহে কখনও কারও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সততা , স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন করার হিম্মত হয়নি।
আরও পড়ুনঃ বড় পরিবর্তন কলকাতা মেট্রোতে! পরিষেবায় কাটছাঁট
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একসময়ে রাজ্য মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সেইসময়ে তাঁর মন্ত্রিত্ব-ত্যাগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিস্তর বিতর্ক হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পাম অ্যাভেনিউয়ের বাড়িতে বসবাস করেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো শুধু রাজনীতি নয় নাটক বা কবিতা নিয়ে লেখালিখি করতে বা আড্ডা দিতেই ভালবাসতেন। মার্ক্স, মায়াকোভস্কি, তাঁকে বেশি উজ্জীবিত করতেন। আক্ষরিক অর্থেই তিনি সেই বিরল বাঙালি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অন্যতম যাঁর সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধীরা কখনও প্রশ্ন তোলার সাহস দেখাতে পারেন নি।
বামপন্থী পরিবারে বেড়ে উঠলেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছাত্রাবস্থায় গোড়া থেকে রাজনীতিতেও আসেননি।
১৯৬৬ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সিপিএমের সদস্য হয়েছিলেন । ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন (ডিওয়াইএফআই)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক হন ষাটের দশকের শেষের দিকে। খাদ্য আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন ।১৯৭৭ সালে কাশীপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রথমবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিধায়ক হয়েছেন। রাজ্য মন্ত্রিসভায় তথ্য ও জনসংযোগ দফতরের দায়িত্ব পালন করেন। এটি পরে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর নামে পরিচিত হয়। ১৯৮২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হন বুদ্ধদেব। পরে ১৯৮৭ সালে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জিতে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হন। সেই থেকেই তাঁর নির্বাচনী কেন্দ্র ছিল যাদবপুর।
২০০১ সাল, যখন অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেছিলেন রাজ্যের পালাবদল হতে পারে! কিন্তু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে। পরের বার, অর্থাৎ ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪-এর মধ্যে ২৩৫টি আসনে জেতে বামফ্রন্ট। ফের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলে সিঙ্গুর,নন্দীগ্ৰাম ব্যাপক বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়।
শুধু বাম মনস্ক কেন রাজনীতি সচেতন মানুষদের কাছে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জনপ্রিয়তা এখনও আকাশচুম্বী। তাঁর পাম অ্যাভেনিউর সাদামাটা বাড়িটা যেন প্রতিদিন শেখায় সততা, স্বচ্ছতা, মূল্যবোধ বাঙালির জীবনের একটা আকর। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেটি ধারণ করেছিলেন জীবনে, মননে, ব্যক্তিগত জীবনচর্চায়।
একটা তথ্য হয়ত অনেকের কাছেই অজানা !
উদ্যোগটা অবশ্যই নির্মাল্য আচার্য’র সহায় হলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তথা তদানীন্তন রাজ্য সরকার। বাংলার গর্ব, ভারতের গর্ব সত্যজিৎ রায়ের সুচিকিৎসার আর কোনও প্রতিবন্ধকতা হয়নি। সত্যজিৎ রায় জায়া বিজয়া রায়কে নির্মাল্য আচার্য বললেন আমি অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম কিভাবে মানিকদাকে সাহায্য করা যায়। সবাই ভাবে মানিকদার অনেক টাকা, আসলে মানুষটাকে কেউ সে অর্থে চেনে না। একই সঙ্গে একথা জানাতে ভুললেন না পশ্চিমবঙ্গ সরকার মানিকদাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। একবার যদি অ্যাপ্রোচ করি কিছু একটা বিহিত হবে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে আমি চিনি,তাই ওঁকেই সব জানালাম। এবং এক মুহুর্তে সব মীমাংসা হয়ে গেল।
আরও পড়ুনঃ বাতিল একাধিক ট্রেন, ভিড় নিয়ন্ত্রণে বাড়তি ব্যবস্থা
সত্যজিৎ রায়ের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। বেলভিউ নার্সিং হোমে আইসিইউতে অনেকদিন চিকিৎসার পরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কয়েকটি মাস পরে আবার তিনি অসুস্থ হলেন সেদিন ১১ মার্চ রবিবার ১৯৮৪, কিছুটা বিকৃত কণ্ঠে জায়াকে বললেন ” আমার বুকে ও চোয়ালে ভীষণ ব্যাথা করছে তুমি শিগগির ডাক্তারদের খবর দাও”। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবার নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে জীবন – মৃত্যুর সাথে লড়াই। ডাক্তার বক্সি বলেছিলেন খুব ভাল হয় যদি সত্যজিৎ রায়ের বাইপাস অপারেশন করা হয়। তখন এদেশে হার্টের এত অ্যাডভান্সড চিকিৎসা সেভাবে শুরু হয় নি। সবথেকে ভাল জায়গা আমেরিকা, ওখানে এই চিকিৎসা প্রথমে শুরু হয়েছিল। ডাক্তার বক্সির একান্ত ইচ্ছা সত্যজিৎ রায় যেন হার্টের চিকিৎসা করতে আমেরিকা যান। কিন্তু আমেরিকায় বাইপাস অপারেশনের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এত টাকা কিভাবে পাবেন, বিজয়া রায় চিন্তিত একই সঙ্গে তিনি চান তাঁর স্বামী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠুন। মানিকবাবু যখন নার্সিং হোমে ভর্তি বিজয়া রায়েরা নিয়মিত নার্সিং হোমে যেতেন তখন নির্মাল্য আচার্য তাদের বাড়িতে আসা ফোন কলগুলোর উত্তর দিতেন।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্য, আশুতোষ কলেজে পড়াতেন।ধীর- স্থির,বলেন কম, শোনেন বেশি। তারা একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। মানিকবাবুকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অনুরোধ করলেন ‘ এক্ষণ ‘ পত্রিকার মলাটটা যেন তিনি এঁকে দেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অনুরোধ করলে মানিকবাবু কখনও ‘ না’ শব্দটি উচ্চারণ করতেন না। যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন ততদিনে ‘ এক্ষণ’ এর মলাট এঁকে দিয়েছিলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বন্ধুটি হলেন অধ্যাপক নির্মাল্য আচার্য। ক্রমেই তাঁর সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের পরিবারের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে অধ্যাপক নির্মাল্য আচার্যর। যেদিন বিজয়া রায় শোনেন তাঁর স্বামীর চিকিৎসার খরচ রাজ্য সরকার দেবে তিনি নির্মাল্যর হাত ধরে বলেছিলেন ” তুমি যা করলে জীবনেও শোধ করতে পারব না”। আজ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্মদিনে আমরা (বঙ্গবার্তা) তাঁকে স্মরণ করি।









