কয়লার আগুন, যানবাহনের ধোঁয়া, অনিয়ন্ত্রিত কলকারখানা এবং শিল্প কেন্দ্রের বর্জ্য কলকাতার দূষিত বাতাসের প্রধান কারণ। অবশ্য আরও একটি কারণ রয়েছে, যাকে একেবারেই উপেক্ষা করা ঠিক নয় কিন্তু খুব কমই সমাধান নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা হয়। এবার ভাবনা চিন্তা শুরু করা উচিত। আর তা হল বর্জ্য পোড়ানো এবং সেখান থেকে সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়া। এই সবটাই পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, কঠিন বর্জ্যে প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে গুরুতরভাবে বেড়ে যায় স্বাস্থ্যের ঝুঁকি। খোলা জায়গায় পোড়ানো হলে প্লাস্টিক অত্যন্ত বিষাক্ত এবং কার্সিনোজেনিক নির্গত করে।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কলকাতার দূষিত বাতাসের প্রধান কারণ নির্ধারণের জন্য দ্য এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আবর্জনা পোড়ানো পিএম ১০ এবং আরও মারাত্মক পিএম ২.৫ উৎপাদনে ৫ শতাংশ ভূমিকা রাখে। এই উভয় ক্ষুদ্র কণাই আমরা বাতাসের সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করি। এই দুটির মধ্যে, পিএম ২.৫, ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার কম ব্যাসের কণা হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বৃহত্তর ঝুঁকি কারণ। এই বিষাক্ত কণাই মানুষের ফুসফুসে ঢুকতে পারে। যার পরিণতিতে অসুস্থতা এবং প্রাণহানিও ঘটতে পারে।
প্রতি শীতকালে, কলকাতার বাতাসের মান নিম্নগামী হয় এবং তাপমাত্রার পারদও কমে যায়। শনিবার সকাল ১০ টায়, ভিক্টোরিয়ায় বাতাসের মান খুব খারাপ ছিল। বালিগঞ্জ, বিধাননগর, যাদবপুর এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিটি রোড ক্যাম্পাস) বাতাস আরও খারাপ ছিল। তবে ফোর্ট উইলিয়ম এবং রবীন্দ্র সরোবরে বাতাসের মান ছিল মাঝারি।
কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড কর্তৃক প্রস্তুত জাতীয় বায়ু মানের সূচকে “মাঝারি” “ভালো” এবং “সন্তোষজনক” এর নীচে তৃতীয় স্থানে রয়েছে কলকাতা। অপর দিকে “নিরাপদ” এবং “খুব খারাপে”র ওপর রয়েছে কলকাতার বাতাস। গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালে দূষণের উৎসগুলি একেবারে যে থাকে না তা নয়, উষ্ণ বাতাস এবং বৃষ্টির মতো জলবায়ুগত কারণগুলি কিছু দূষণকারী পদার্থগুলিকে ছড়িয়ে দেয় বা ধুয়ে ফেলে। এতে দূষণের মাত্রাটা কিছুটা হলেও কম থাকে। তবে শীতকালে, বাতাস ঠান্ডা এবং ভারী থাকে। ফলে উষ্ণ বাতাসের মতো দ্রুত উপরে ওঠে না। শীতকালে বাতাসের গতিও সাধারণত কম থাকে। তাই এই সমস্ত দূষণকারী পদার্থগুলি আটকে থাকে নিম্ন বায়ুমণ্ডলে।
কলকাতায় দূষিত বাতাসের প্রধান উৎসগুলি হল ধুলো, কয়লা এবং জৈববস্তু পুড়িয়ে রান্না, যানবাহনের ধোঁয়া নির্গমন, শিল্প দূষণ এবং আবর্জনা পোড়ানো। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হল ধুলো, পিএম ১০। দূষণ সৃষ্টির জন্য ৪৩ শতাংশ দায়ী। রাস্তার ধারের খাবারের দোকান, খোলা জায়গায় রান্নার জন্য কয়লার ব্যবহার, জৈববস্তুর ব্যবহার এবং ইস্ত্রি করে কয়লার ব্যবহার সহ আরও নানা কারণে পিএম ২.৫ দূষণ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে। আনুমানিক দূষণের ২৯ শতাংশ ভূমিকা পালন করে। একইভাবে শিল্প দূষণ ২১ শতাংশ এবং যানবাহন ২০ শতাংশ ধোঁয়া ছড়ায়।
পিএম১০ এবং পিএম২.৫ উভয়ই আমাদের ক্ষতি করে। কিন্তু পিএম২.৫ আরও বেশি ক্ষতি করে। পিএম২.৫-তে সূক্ষ্ম এবং অতি-সূক্ষ্ম উভয় ধরনের কণাই থাকে, যা ফুসফুসজুড়ে ভ্রমণ করতে পারে। এই কণাগুলি রক্ত সঞ্চালনে প্রবেশ করতে পারে এবং সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কলকাতা মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পালমোনোলজিস্ট অরূপ হালদার বলেন, “শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রভাব এক্সপোজারের সময়কাল ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিন ধরে এক্সপোজারের স্পষ্টতই খারাপ প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য তীব্র এক্সপোজারও ক্ষতির কারণ হয়।”
বায়ুর মান সূচক (AQI) অনুসারে, “মাঝারি” বায়ুর মানও হাঁপানি, ফুসফুসের রোগ এবং হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে। “খারাপ” বাতাসের গুণমান কমে গেলে দীর্ঘদিন ধরে সংস্পর্শে থাকার ফলে বেশিরভাগ মানুষের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে “খুব খারাপ” বাতাস দীর্ঘক্ষণ সংস্পর্শে থাকার ফলে “শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতা” দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকরা বলেছেন পিএম ১০ বেশিরভাগই গলা এবং বৃহৎ শ্বাসনালীতে জমা হয়। এগুলি নাক এবং বৃহৎ শ্বাসনালীতে জ্বালাভাবের সৃষ্টি করে।
আরও পড়ুনঃ “আবার সে এসেছে ফিরিয়া”; আজকে এই ভরা শীতে বিশ্বকর্মা পুজো! পুজো করছে কারা? কোথায় হচ্ছে?
নয়াদিল্লির সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের পরিচালক অনুমিতা রায় চৌধুরী বলেন, “পিএম২.৫ এর উৎপাদনে অবশ্যই রাশ টানতে হবে। শিল্প দূষণ, যানবাহনের নির্গমন এবং বর্জ্য পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের করণীয় তালিকার শীর্ষে থাকা উচিত। শিল্প দূষণের উৎসগুলি বেশিরভাগই স্থানীয় এবং পার্শ্ববর্তী। সরকারের উচিত একটি অঞ্চলের মধ্যে শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সুকৌশল ঠিক করা। এটা করতে পারলেই কলকাতার বায়ুর মান উন্নত করা সম্ভব হবে। হতে পারে সে দূষণ হাওড়া অথবা কলকাতার উপকণ্ঠ থেকে আসছে। এর সঙ্গে পার্শ্ববর্তী জায়গাগুলির কথাও বিবেচনা করা উচিত।”
ডিজেল এবং পেট্রোলচালিত যানবাহনের পরিবর্তে আরও বৈদ্যুতিক যানবাহন বেশি বেশি ব্যবহার করতে হবে। সমস্ত কয়লাচালিত ওভেনকে বিদ্যুৎচালিত ইন্ডাকশন ওভেন দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে বায়ু দূষণে ছোট খাবারের দোকানগুলির ভূমিকা কমে যাবে। হকার এবং যারা ইস্ত্রি ইউনিট চালান তাঁদের বৈদ্যুতিক চালিত ইন্ডাকশন ওভেন বা হিটিং চালানোর জন্য উৎসাহিত করা উচিত।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান পুনর্বসু চৌধুরী বলেন, “সরকারের উচিত তাদের ভর্তুকিযুক্ত বিদ্যুৎব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের কর্তারা জানান, শহরজুড়ে নির্মাণ কাজের কারণে বাতাসে এত ধুলো ঝুলে আছে। জল ছিটিয়ে রাস্তার ধুলো ওড়ানো বন্ধ করা যেতে পারে। নির্মাণস্থলের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জল ছিটিয়ে মাটি এবং নির্মাণ সামগ্রী আর্দ্র রাখা উচিত। এটি ধুলো উড়তে বাধা দেবে।”









