নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এক অস্বাভাবিক চরিত্র—কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র এবং র্যাপার বলেন্দ্র শাহ, যিনি সবার কাছে পরিচিত বালেন নামে। পর্যবেক্ষকদের মতে, জনপ্রিয়তার ঝড়ে ভেসে উঠে আসা এই তরুণ নেতার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, নিজেকে আরও পরিণত, সংযত ও কূটনৈতিক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা—বিশেষত সাংবাদিক, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রতিবেশী শক্তি ভারত ও চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
২০১০-এর সময়ে নেপালের র্যাপ সংস্কৃতিতে প্রথম পরিচিতি পান বালেন শাহ। ভারতের কর্ণাটকে পড়াশুনো করা এই স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের র্যাপ গান ‘বলিদান’, যেখানে নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছিল। ২০২০ সময় তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পান এবং ইউটিউবে ইতিমধ্যেই এক কোটিরও বেশি দর্শক এই গানটি শুনেছেন।
আরও পড়ুনঃ চীন ইরান যুদ্ধে যোগ দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে! US ইন্টেলিজেন্সের নতুন রিপোর্টে বাড়ছে উদ্বেগ
এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই ২০২২ সালে তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হন। দায়িত্ব গ্রহণের পর শহরের রাস্তায় দখলদারি সরাতে বুলডোজার অভিযান চালিয়ে দ্রুত আলোচনায় আসেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতেন, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে এক দৃঢ় প্রশাসকের ভাবমূর্তি তৈরি করে দেয়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ও রাজনৈতিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া জেন-জি আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান বালেন। ফেসবুক ও এক্সে নিয়মিত পোস্ট করে তিনি তরুণদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। সেই সময় তাঁর গান “Ma Nepal Hasenko Herna Chahanchhu” আন্দোলনের এক ধরনের সংগীতে পরিণত হয়।
কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। সিংহ দরবার ও সংসদ ভবনসহ একাধিক সরকারি অফিসে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি সহ শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, নেপালি সেনাবাহিনী পর্যন্ত বালেন শাহের কাছে আবেদন জানায়—তিনি যেন সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্দোলন থামানোর আহ্বান জানান। পরে পরিস্থিতি সামলাতে তিনি তা করেও ছিলেন।
তবু, ২০২৪ সালের ৯-ই সেপ্টেম্বর জেন-জি আন্দোলনে প্রাণ হারান ৭৭ জনের বেশি মানুষ। দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলার মধ্যে শেষ পর্যন্ত কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
এর মাত্র তিন মাস পরে, বালেন শাহ মেয়র পদ ছেড়ে যোগ দেন রবি লামিছানের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি (RSP)-তে এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হন। নির্বাচনে তিনি ঝাপা–৫ আসনে সরাসরি কেপি শর্মা অলিকে পরাজিত করেন। দেশজুড়ে আরএসপি-র প্রার্থীরাও একের পর এক জয় পেয়ে নেপালের পুরনো রাজনৈতিক শক্তি—নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল, প্রচণ্ডের কমিউনিস্ট শিবির ও রাজতন্ত্রপন্থী আরপিপি—কে পিছনে ফেলে দেয়।
যদিও, আরএসপি-র সভাপতি রবি লামিছানে কো-অপারেটিভ জালিয়াতি সহ একাধীক মামলায় জড়িত। তবুও তা দলের নির্বাচনী সাফল্যে প্রভাব ফেলেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এর বড় কারণ বালেন শাহের বিপুল জনপ্রিয়তা এবং সেই বিশ্বাস—তিনি একাই কাঠমান্ডুর চেহারা বদলে দিয়েছেন, যদিও শহর এখনও দূষণ ও আবর্জনার সমস্যায় জর্জরিত।
আরএসপি তাদের ঘোষণাপত্রে দুর্নীতি দমন, দশ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পাঁচ বছরে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতির জোরেই নেপালের ভোটাররা যেন প্রতীকী অর্থে দলের নির্বাচনী প্রতীক ‘ঘণ্টা’ বাজিয়ে পুরনো রাজনীতিকে বিদায় জানিয়েছেন।
তবে সামনে পথ সহজ নয়। সমালোচকদের মতে, বালেন শাহ ও তাঁর দলের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সীমিত। উপরন্তু, মেয়র থাকাকালীন তাঁর কিছু কঠোর ও বিতর্কিত পদক্ষেপ, যেমন রাস্তার হকার উচ্ছেদ সহ একাধীক প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারও বহুবার বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি ভারত, চিন ও আমেরিকাকে কটাক্ষ করে লিখেছিলেন—“তোরা সবাই মিলে কিছুই করতে পারবি না।” পরে পোস্টটি ডিলিট করে দিলেও, তার স্ক্রিনশট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগেও তিনি বিতর্কে জড়িয়েছেন বেশ কয়েকবার। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ট্র্যাফিক পুলিশ তাঁর গাড়ি থামানোর পর ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছিলেন—“প্রয়োজনে সিংহ দরবারে আগুন লাগিয়ে দেব।” আবার আবর্জনা সমস্যায় তিনি বলেছিলেন, দেশের নেতাদেরই সিসডোলে ফেলে দেওয়া উচিত।
আরও পড়ুনঃ বড় ধাক্কা ইরানের; আগদাসিয়েহ তেল ডিপোতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ভয়াবহ পরিণতি
১৯০৮ সালে নির্মিত ঐতিহাসিক সিংহ দরবার আজ নেপালের প্রশাসনিক কেন্দ্র। ২০২৪ সালের জেন-জি আন্দোলনে এখানকার বহু ভবন আগুনে পুড়ে যায়, যার পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে।
এখন নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে বালেন শাহ নেপালের ক্ষমতার শীর্ষে উঠতে চলেছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হল জনপ্রিয়তার রাজনীতি ছেড়ে, সংযত ও কূটনৈতিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা।
কারণ নেপালের সামনে বড় বাস্তবতা হল অভিবাসন সামলানো। লক্ষ লক্ষ নেপালি বিদেশে কাজ করেন, যার মধ্যে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে। বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে দেশে ফিরিয়ে আনা—হতে পারে নতুন সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা।
বালেন শাহের উত্থান নিঃসন্দেহে নেপালের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কিন্তু জনপ্রিয়তার ঢেউ আর রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা এক নয়। এখন দেখার, র্যাপার থেকে উঠে আসা এই তরুণ নেতা সেই কঠিন পরীক্ষায় কতটা সফল হন।









