নির্বাচনের মুখে উত্তরবঙ্গে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ালেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী । শুক্রবার শিলিগুড়ি পৌঁছেই শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তিনি । বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাঁর কড়া আক্রমণ, “মুখ্যমন্ত্রী নিজে একজন রেজিস্টার্ড লায়ার । চোরেদের রানি, মিথ্যার রানি ! নিজে চোর, এখন চোরেরাই চিৎকার করছে ।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে ।
শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণেই থেমে থাকেননি শুভেন্দু । সাম্প্রতিক সময়ে হুমায়ুন কবিরের ‘বাবরি মসজিদ’ প্রসঙ্গ টেনে তিনি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দেন । তাঁর বক্তব্য, “আমরা বাবরি মসজিদের বিরুদ্ধে । যারা বাবরের নাম ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধেও আমরা । তবে এই ইস্যুতে আসল কথা হুমায়ুন কবিরকেই বলতে হবে ।” এরপরই তৃণমূলকে সরাসরি নিশানা করে বলেন, “এটা আসলে এ-টিম ও বি-টিমের খেলা । তৃণমূল কংগ্রেস এ-টিম, আর হুমায়ুনদের দল বি-টিম ।”
আরও পড়ুনঃ ‘পহেলগাঁও হয়েছিল বলেই আজ পাকিস্তানে শান্তি আলোচনা হচ্ছে!’ মত লস্কর নেতা মুসার
এদিন ভবানীপুরের ভোলাগিরি আশ্রমে হামলার ঘটনাতেও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান শুভেন্দু । তাঁর অভিযোগ, “তৃণমূল কংগ্রেস গেরুয়া দেখলেই আক্রমণ করে । এই রাজ্যে সনাতনীরা নিরাপদ নয়। মুখ্যমন্ত্রীর নিজের কেন্দ্রেই সাধুদের গায়ে হাত দেওয়া হয়েছে। এটা লজ্জাজনক।” তিনি আরও বলেন, “এই ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা উচিত । যেহেতু এখন আইনশৃঙ্খলা নির্বাচন কমিশনের হাতে, তাই সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশকে সাসপেন্ড করা দরকার।”
শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি জলপাইগুড়ির বেলাকোবায় পৌঁছে নির্বাচনী প্রচারে ঝড় তোলেন শুভেন্দু । জলপাইগুড়ি সদর ও রাজগঞ্জ বিধানসভার বিজেপি প্রার্থীদের সমর্থনে হুডখোলা গাড়িতে রোড-শো করেন তিনি । তাঁর সঙ্গে ছিলেন জলপাইগুড়ি সদর কেন্দ্রের প্রার্থী অনন্তদেব অধিকারী এবং রাজগঞ্জের প্রার্থী দীনেশ সরকার (হারাধন) । বিশাল জনসমাগমে কার্যত থমকে যায় বেলাকোবা ।
সভামঞ্চ থেকে একের পর এক প্রতিশ্রুতি দেন শুভেন্দু । তিনি ঘোষণা করেন, উত্তরবঙ্গের সমস্ত NBSTC সরকারি বাসে ছাত্রছাত্রী ও মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াত চালু করা হবে । পাশাপাশি কেন্দ্রীয় প্রকল্প ‘আয়ুষ্মান ভারত’ রাজ্যে কার্যকর করা হবে বলেও জানান । কৃষকদের জন্য বড় ঘোষণা করে বলেন, “3100 টাকায় ধান কেনা হবে ।” শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, “সরকারি স্কুলগুলিকেই এমনভাবে উন্নত করা হবে, যাতে আর প্রাইভেট স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন না হয় ।” মিড-ডে মিল প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, “শুধু খাবার নয়, একদিন পনির, একদিন ফল, প্রতিদিন গ্লাস ভর্তি দুধ দেওয়া হবে ।”
শুভেন্দু তাঁর বক্তব্যে বিজেপির ‘সংকল্প পত্র’র প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “আজ অমিত শাহ সংকল্প পত্র ঘোষণা করেছেন । আমরা যা প্রতিশ্রুতি দিই, তা পূরণ করি । একুশটি রাজ্যে তার প্রমাণ রয়েছে ।” তাঁর স্লোগান, “ভয়মুক্ত বাংলা গড়তে হলে বিজেপিকে আনতেই হবে ।” পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, “চার তারিখ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করবে । ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী হারবেন ।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ থেকে আসা প্রকৃত শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া হবে, আর অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানো হবে । পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে এনে কাজ দেওয়া হবে । সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকদের বকেয়া ডিএ মেটানো হবে । মা-বোনেদের জন্য মাসে 3000 টাকা ভাতা দেওয়া হবে ।”
রাজগঞ্জে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তুলে শুভেন্দু বলেন, “পঞ্চায়েত সমিতিতে চুরি, দুর্নীতি চলছে । পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করা হচ্ছে ।” এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে মানুষকে ভোট দিয়ে জবাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি ।
এদিকে শুভেন্দুর আগমনের আগেই রাজগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক খগেশ্বর রায়কে নিয়ে একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁকে শুভেন্দুর সঙ্গে একই গাড়িতে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয় । যদিও সেই দাবি সম্পূর্ণ খারিজ করে খগেশ্বর রায় জানান, এটি একটি ‘এআই-নির্মিত’ ভুয়ো ছবি ।



