মধ্যপ্রাচ্য থেকে পণ্য রফতানির গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী ৷ পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে দক্ষিণ ইরানের এই সঙ্কীর্ণ জলপথ যুগ যুগ ধরে তেল-সহ নানাবিধ পণ্য পরিবহণের উল্লেখযোগ্য রাস্তা হয়ে উঠেছে ৷ ইজরায়েল ও আমেরিকার হামলার পর এই কৌশলী জলপথটি বন্ধ রাখার ঘোষণা করেছে ইরান ৷
ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কোর-এর উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইব্রাহিম জাব্বারি দেশের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে হুমকি দিয়ে বলেছেন, “হরমুজ প্রণালী বন্ধ ৷ এই অঞ্চলে কারও আসার দরকার নেই ৷ এই পথ দিয়ে কেউ যেতে চাইলে আমাদের আইআরজিসি এবং নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর যোদ্ধারা সেই জাহাজগুলিতে আগুন ধরিয়ে দেবে ৷”
আরও পড়ুনঃ যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত ট্রাম্প! বিস্ফোরক নথি প্রকাশ্যে
এই সিদ্ধান্ত বিশ্বের শক্তিসম্পদের বাজারের জন্য বড় ধাক্কা ৷ সঙ্কীর্ণ পথ দিয়ে বিশ্বের দৈনন্দিন প্রয়োজনের 20 শতাংশ তেল পরিবহণ হয় ৷ মাত্র ৩৩ কিমি চওড়া এই জলপথটি পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ তৈল উৎপাদনকারী দেশ- সৌদি আরব, ইরান, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমির শাহির সঙ্গে ওমান ও আরব উপসাগরকে যুক্ত করেছে ৷
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে এশিয়া-ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে কোনও প্রভাব পড়বে না ৷ তবে পারস্য উপসাগর একমুখী এবং কুয়েত, ইরাক ও ইরানের মধ্যে আবদ্ধ ৷ আর তাই সেদিক থেকে এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালীটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ৷ সেখানে ব্যাপক প্রভাব পড়বে ৷ দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার কন্টেনার আসে বা এখান থেকে কন্টেনার বোঝাই হয় জাহাজে ৷ এটি বিশ্বের দশম বৃহত্তম কন্টেনার ওঠানামাকারী বন্দর ৷ এখান ১২টিরও বেশি দেশে পণ্য বণ্টন হয় ৷ এই বন্দরে কন্টেনার বোঝাই জাহাজ থেকে ছোট ছোট জাহাজে পণ্য নামিয়ে সেগুলি ভারত ও পূর্ব আফ্রিকার দিকে রওনা দেয় ৷

মেরিটাইম ইকোনমির ফ্রেঞ্চ হাই ইনস্টিটিউট-এর ডিরেক্টর পল টুরেটের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে অতীতে হরমুজ প্রণালী সবসময় খোলা থেকেছে ৷ ১৯৮০-১৯৮৮ সালের মধ্যে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়েও এই পথটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ যাতায়াত করেছে ৷ অথচ সেই সময়েও তেলের ট্যাঙ্কারের উপর আক্রমণ করা হয়েছিল ৷ এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্য পরিবহণকারী জাহাজ যাতায়াতে যে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, তা অভাবনীয় বলে জানালেন সিরিল পয়েরির কুটানসাইস ৷ তিনি ফরাসি নৌবাহিনীর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক অধিকর্তা ৷
আরও পড়ুনঃ ‘বড় আঘাত’! ব্রিটিশ ঘাঁটিতে মার্কিন B-2 স্টিলথ বোমারু মোতায়েন
গত শনিবার ইরানের উপর যৌথ হামলা চালায় আমেরিকা ও ইজরায়েল ৷ এরপর আচমকা হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়েছে বহু পণ্য বোঝাই জাহাজ ৷ তার মধ্যে রয়েছে ইটালি ও সুইৎজারল্যান্ডের এমএসসি, ডেনমার্কের মায়েরস্ক, ফ্রান্সের সিএমএ সিজিএম, জার্মানির হাপাক লায়লড এবং চিনের কসকো’র মতো বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজ কোম্পানির জাহাজ ৷ তারা সংশ্লিষ্ট পণ্যবাহী জাহাজগুলির কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে নিরাপদ জায়গায় খুঁজে আশ্রয় নিতে হবে ৷
মেরিটাইম ইকোনমির ফ্রেঞ্চ হাই ইনস্টিটিউট-এর ডিরেক্টর পল টুরেটের জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের গতিবিধিতে নজর রাখে মেরিন ট্রাফিক ৷ তারা জানিয়েছে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বহু পণ্যবাহী জাহাজ ৷ তাদের মধ্যে তেলের ট্যাঙ্কারগুলি প্রণালী থেকে বেশ খানিকটা দূরে কুয়েতের কাছে উত্তরদিকে নোঙর ফেলেছে ৷ এছাড়া কয়েকটির অবস্থান দুবাইয়ের দিকে । অন্যদিকে, বান্দার আব্বাস বন্দরে ইরানর বেশকিছু মার্চেন্ট নেভির জাহাজ দেখা যাচ্ছে ৷ আবার হরমুজে প্রবেশের আগে কয়েকটি জাহাজ অপেক্ষায় রয়েছে ৷
জার্মানির গাড়ি, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং কারখানায় উৎপাদিত শিল্পজাত পণ্য এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে ৷ ফ্রান্সের শস্য থেকে কৃষিজ পণ্য, সাজসজ্জার জিনিসপত্র, বিলাসবহু সামগ্রী এবং ওষুধপত্র যায় হরমুজ দিয়ে ৷ ইতালি খাবারদাবার, বিপুল পরিমাণে পাথর ও সেরামিক্স-এর দ্রব্য় রফতানি হয় ৷ তেল ও গ্যাস ছাড়া বিশ্বের 9 শতাংশ প্রাথমিক অ্যালুমিনিয়ামও উৎপাদিত হয় মধ্যপ্রাচ্যে ৷ এর প্রায় সবই রফতানি হয় এই পথ দিয়ে ৷
ইতিমধ্যে অনলাইনে ই-কমার্স সংস্থাগুলি তাদের গ্রাহকদের সতর্ক করেছে, পণ্য ডেলিভারিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় লাগতে পারে ৷ টেমু অ্যান্ড শিন জানিয়েছে বেশ কয়েকদিন দেরি হবে ৷ অ্যামাজনও একই কথা জানিয়ে রেখেছে ৷ এর সঙ্গে বেড়ে চলেছে পরিবহণের খরচও ৷ তাই জাহাজ কোম্পানিগুলিও অতিরিক্ত দাম আরোপ করেছে ৷ ইউরোপ-এশিয়া রুটের জাহাজগুলি এখন ইরানের মিত্র ইয়েমেন, হাউথিদের আক্রমণের ভয়ে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের রাস্তা ধরছে না ৷ তার বদলে দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তে কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে আসছে ৷ এর জেরে অতিরিক্ত ১০ দিন সময় লাগছে ৷ পণ্যের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হচ্ছে ৷









