কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে শুরু থেকেই গা-ছাড়া মনোভাব দেখিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস ৷ এমনকি জোট নিয়ে দু’পক্ষে একবারের জন্য আলোচনাতেও বসেনি ৷ এই পরিস্থিতিতে দু’তরফেই টানাপোড়েন চলছিল ৷ যা নিয়ে শনিবার সরাসরি কংগ্রেসকে নিশানা করলেন সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ৷ যেখানে সরাসরি, প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে দিল্লির হাইকমান্ডের ইশারায় চলা দল বলে নিশানা করলেন তিনি ৷
আরও পড়ুনঃ তপ্ত এলাকা, প্রতিবাদ, অবরোধ, লাঠিচার্জ! কোচবিহারে নদীপাড়ে ‘দাদু’-র ধর্ষণ
সেলিম বলেন, “এসআইআর-এর নামে মানুষকে হয়রানি করছে নির্বাচন কমিশন ৷ জ্ঞানেশ কুমার জন্মানোর আগে থেকে ভোটার তালিকায় মানুষের নাম রয়েছে ৷ নাম জ্ঞানেশ কুমার হলেও, তাঁর আসল নাম জ্ঞান পাপী ৷ এটা আরএসএস-এর পরিকল্পনা ৷ বামফ্রন্ট যখন ছিল, আমরা একসঙ্গে ছিলাম ৷ এরা এসে সব ভাগ করল ৷”
এরপরেই সরাসরি কংগ্রেসকে নিশানা করলেন সেলিম ৷ তিনি বলেন, “বামফ্রন্ট এমনি-এমনি যায়নি ৷ এই কংগ্রেস 2011 সালে নিজের কাঁধ দিল ৷ সেই কাঁধে ভর দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাইটার্সে উঠলেন ৷ তারপর তিনি রাইটার্সও ত্যাগ করলেন ৷ তৃণমূল বিজেপিকেও ত্যাগ করল ৷ এখনও যদি কংগ্রেসের শিক্ষা না-হয়, তবে কবে হবে আমি জানি না ৷ যাঁরা পুরনো তৃণমূল, তাঁদেরও একই অবস্থা হয়েছে ৷ কিষেনজি বলেছিলেন, মমতাকে মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চান ৷ পরে সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁকে খুন করেছিলেন ৷ মালদা জেলা কংগ্রেসকে বলছি, বামপন্থীরা জান দিয়ে খাটার জন্যই চব্বিশের নির্বাচনে কংগ্রেস এখানে একটি আসন পেয়েছে ৷ এখন প্রদেশ কংগ্রেস আর দিল্লির কোনও-কোনও নেতা চিন্তা করছেন, কোনদিকে গেলে লাভ ৷ এটা শাক-সবজির বাজার নয় ৷ নীতি ঠিক করতে হবে ৷ বাংলা বাঁচাতে গেলে বিজেপি-তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়তে হবে ৷ কিন্তু, ওরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না ৷ জেলা ভাবছে, রাজ্য কী করবে, রাজ্য ভাবছে, দিল্লি কী করবে ৷ বাংলার সব মানুষ যদি এককাট্টা হয়, তাহলে নবান্নকে আমরা একাই শায়েস্তা করতে পারি ৷ এটা মিটিং নয়, আজ আমরা এখান থেকে যুদ্ধের বিউগিল বাজালাম ৷”
উল্লেখ্য, কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন জানিয়েও এ দিন মালদায় সভার জন্য মাঠ ব্যবহারের অনুমতি পায়নি সিপিআইএম ৷ অবশেষে 12 নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেই জনসভা করল সিপিআইএম ৷ ফলে শনিবার দুপুর থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য অবরুদ্ধ হয়ে রইল জাতীয় সড়ক ৷ দুর্ভোগ পোহাতে হল আমজনতাকে ৷ তবে, এদিন জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে রইলেও সিপিআইএম নেতৃত্বকে সভা করায় কোনও বাধা দেয়নি পুলিশ ৷ এদিকে এদিনের সভায় তৃণমূল-বিজেপিকে তুলোধনা করার পাশাপাশি গত কয়েকটি নির্বাচনের জোট সঙ্গী কংগ্রেসেরও কড়া সমালোচনা করলেন সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ৷
আরও পড়ুনঃ শৈলরানিতে পর্যটকদের দাদাগিরি; চালকের উপর অস্ত্র দিয়ে হামলা
আদালতের নির্দেশ শোনার পরেই জেলা সিপিআইএম নেতৃত্ব এই সভা মালদা শহরের কেন্দ্রস্থল, রথবাড়ি মোড়ে করার সিদ্ধান্ত নেয় ৷ এদিন সকাল থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তৈরি হয় সভামঞ্চ ৷ বেলা একটা থেকে সভা শুরু হয় ৷ তার আগে থেকেই লাল পতাকা নিয়ে দলীয় কর্মী-সমর্থকরা সভায় আসতে শুরু করেন ৷ বেলা দু’টো নাগাদ সভাস্থলে পৌঁছোন তিন প্রধান বক্তা, দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় ও শতরূপ ঘোষ ৷ তখনও রথবাড়ি মোড়ে 12 নম্বর জাতীয় সড়ক দিয়ে শম্বুক গতিতে যানবাহন চলাচল করছিল ৷ কিন্তু, কিছুক্ষণের মধ্যেই সিপিআইএম কর্মী-সমর্থকদের ভিড়ে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায় জাতীয় সড়ক ৷ উপস্থিত পুলিশকর্মীদেরও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ৷
এদিন সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শতরূপ, মীনাক্ষী, সেলিম, সবার গলাতেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে এনিয়ে অভিযোগ শোনা গিয়েছে ৷ শতরূপ বলেন, “ওরা আজ সমাবেশ আটকাতে পারেনি৷ কাল বিধানসভা যাওয়ার লড়াইও আটকাতে পারবে না৷ নরেন্দ্র মোদি দেখিয়েছিলেন, মন্দির বানিয়ে কীভাবে রাজনীতি করতে হয়৷ কিন্তু যে কাজ বিজেপি করতে পারেনি, সেই কাজ মমতা ব্যানার্জি করে দেখিয়ে দিয়েছেন৷ সরকারি টাকায় মন্দির বানিয়েছেন৷ বেকারদের চাকরি হচ্ছে না, যুবসমাজ ঘামের দাম পাচ্ছে না৷ বেকাররা ওই সব মন্দিরে ভিক্ষা চাইবে৷ এবার মালদা থেকে লাল ঝান্ডা হাতে বিধায়করা বিধানসভায় যাবে৷ সেই 2016 সালের মতো৷ আমাদের লক্ষ্য কিন্তু শূন্যের গেরো কাটানো হয় ৷”
বক্তব্য রাখতে গিয়ে মীনাক্ষী বলেন, “এই সভা পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা বলবে, তৃণমূল সরকারের ওবিসি জ্বালায় জর্জরিত মানুষের কথা বলবে, মাইক্রো ফিনান্সে জালে যাদের জীবন অতিষ্ঠ, তাদের কথা বলবে৷ সেসব কথা বলার জন্য বৃন্দাবনি মাঠ না দিয়ে দালালি করল প্রশাসন৷ দালালি বন্ধ না করলে ছাব্বিশের নির্বাচনের পর এই রথবাড়ি মোড়ে ফুটো বাটি নিয়ে প্রশাসনকে বসতে বাধ্য করবে লাল ঝান্ডা৷ রাজ্যে 100 দিনের কাজ বন্ধ করার জন্য তৃণমূলের সঙ্গে সমান দায়ী এই দালাল প্রশাসন৷ মেহেনতি মানুষের জীবন যন্ত্রণার জন্য দায়ী তৃণমূল, তার শাগরেদ বিজেপি আর দালাল প্রশাসন৷ একটা মাঠের অনুমতি না দিলে কী হবে৷ রাজ্যের প্রতিটি পাড়ায় আমরা চাটাই পাতব, 35 হাজার পাড়া বৈঠক করার কথা ঘোষণা করেছে লাল ঝান্ডা৷ কী করে ওরা বন্ধ করে দেখি ৷”
সভা শুরুর আগে সিপিআইএম-এর জেলা সম্পাদক কৌশিক মিশ্র ইটিভি ভারতকে বলেন, “জেলা প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা এবং অসহযোগিতার জন্যই আজ পর্যন্ত আমাদের সভা করার জন্য মাঠের ব্যবস্থা করা গেল না৷ তৃণমূল সরকারের দলদাস জেলাশাসক, মহকুমাশাসক, ইংরেজবাজার থানার আইসি থেকে শুরু করে প্রত্যেকে পরিকল্পিতভাবে আমাদের সভা করতে বাধা দিয়েছেন৷ 21 তারিখ থেকে জয়েন্ট এন্ট্রাস পরীক্ষা শুরু হয়েছে৷ কিন্তু তার মধ্যেও মালদা কলেজ মাঠে বইমেলা হয়েছে৷ তখন কোনও সমস্যা হয়নি৷ আমাদের যখন কোনও জায়গার ব্যবস্থা করা হয়নি তখন আমরা রাস্তাতেই সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি৷ এক্ষেত্রে পুলিশের আমরা পরোয়া করি না৷ রাস্তা অবরোধ হলে তার দায় প্রশাসন ও পুলিশের ৷”









