বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদন:
শিক্ষক দিবস মানেই কেবল সেই গুণীজনদের স্মরণ করা নয়, যাঁরা আমাদের পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন; বরং তাঁদেরও শ্রদ্ধা জানানো, যাঁরা অন্যায় এবং পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করার শিক্ষা দিয়ে জীবনপথের দিকনির্দেশ করেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রাতঃস্মরণীয় বিপ্লবী সূর্য সেন ছিলেন তেমনই এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। পেশায় গণিতের শিক্ষক এই মানুষটি কীভাবে কেবল বইয়ের পাতা থেকে বের হয়ে তরুণ মননে স্বাধীনতার অগ্নিবীজ রোপণ করেছিলেন, তা আজও ভারতের ইতিহাস তথা শিক্ষক দিবসের প্রাসঙ্গিকতায় এক পরম প্রেরণা।
শিক্ষকের অনুপ্রেরণা থেকে বিপ্লবের সূচনা
১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন সূর্য সেন। তাঁর পিতা রামনিরঞ্জন সেনও ছিলেন একজন শিক্ষক। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়:
-
বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের অধ্যায়: ১৯১৬ সালে বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়ার সময় শিক্ষক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসেন সূর্য সেন। এই শিক্ষকের অনুপ্রেরণাতেই তাঁর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও ব্রিটিশবিরোধী ভাবনার উন্মেষ ঘটে।
-
চট্টগ্রামের ‘মাস্টারদা’: ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে ফিরে একটি জাতীয় বিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। অঙ্কের জটিল সূত্রের পাশাপাশি তিনি ছাত্রদের শেখাতেন অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার মূলমন্ত্র। স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ছাত্ররা তাঁকে ভালোবেসে ডাকতে শুরু করেন ‘মাস্টারদা’।
বিপ্লবী নেতৃত্ব ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযান
অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং কারাবাসের পর মুক্তি পেয়ে মাস্টারদা তরুণ সমাজকে সংগঠিত করতে শুরু করেন। অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বলের পাশাপাশি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তের মতো বীরাঙ্গনারাও তাঁর দর্শনে অনুপ্রাণিত হন।
| ঐতিহাসিক ঘটনা | তারিখ ও মূল বিবরণ |
| চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন | ১৮ এপ্রিল, ১৯৩০: মাস্টারদার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা পুলিশ ও সহায়কারী বাহিনীর অস্ত্রাগার দখল করেন। টেলিযোগাযোগ ও রেল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে চট্টগ্রামে প্রথম স্বাধীন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। |
| জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ | অভিযানের পর জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে অসম সশস্ত্র যুদ্ধে বহু তরুণ বিপ্লবী শহীদ হন। মাস্টারদা আত্মগোপনে থেকে লড়াই চালিয়ে যান। |
| গ্রেফতার ও ফাঁসি | ১৯৩৩ সালে বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তিনি গ্রেফতার হন। চরম শারীরিক নির্যাতনের পর ১২ জানুয়ারি, ১৯৩৪ চট্টগ্রাম জেলে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। |
আরও পড়ুনঃ বদলে যাবে ভূগোল? মানচিত্র থেকে মুছে যাবে বহু এলাকা! অস্তিত্ব সংকটে বাংলা
শ্রেণিকক্ষ থেকে গণচেতনার বার্তা
মাস্টারদা সূর্য সেনের জীবন প্রমাণ করে, একজন শিক্ষকের আসল শক্তি শুধু চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষ বা ব্ল্যাকবোর্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষকের দেওয়া দেশপ্রেম ও সাহসের শিক্ষা কীভাবে একটি পুরো প্রজন্মকে স্বাধিকার আন্দোলনের পথে পরিচালিত করতে পারে, মাস্টারদার জীবনই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। শিক্ষক দিবসে এই মহান বিপ্লবী-শিক্ষকের আত্মত্যাগ ও জীবনধারাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে সমগ্র দেশ।


