বিশেষ সংবাদ প্রতিনিধি:
নিউ ফরাক্কা স্টেশনের কাছে সাম্প্রতিক রেললাইনে ধস কেবল উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ট্রেন ট্র্যাফিক স্তব্ধ করেনি, বরং এক মহা-বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপদ লুকিয়ে রয়েছে ভূগর্ভ ও ভৌগোলিক অবস্থানের আরও গভীরে। যে হারে ভাঙন ও মাটি ধসের ঘটনা ঘটছে, তাতে যে কোনো মুহূর্তে গঙ্গার দুই ধারা—ভাগীরথী ও পদ্মা এক হয়ে মিশে যেতে পারে। আর তা হলে মুর্শিদাবাদ ও মালদহের বিস্তীর্ণ জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বদলে যেতে পারে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র।
ভৌগোলিক অবস্থান ও দেড় কিলোমিটারের বিপজ্জনক ব্যবধান
নিউ ফরাক্কা স্টেশনের ভৌগোলিক সংবেদনশীলতা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক করে তুলেছে:
-
দুই ধারার মাঝে সংকীর্ণ স্থলভাগ: ফরাক্কা স্টেশনের এক পাশে মূল স্রোত (পদ্মা) এবং অন্য পাশে গঙ্গার প্রধান শাখা (ভাগীরথী বা হুগলি নদী)। বর্তমানে এই দুই ধারার মধ্যকার স্থলভাগের দূরত্ব মাত্র দেড় কিলোমিটার।
-
যেসব এলাকা বিলুপ্তির মুখে: এখনই স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নিলে ধুলিয়ান, বল্লারপুরের মতো প্রাক-ঐতিহাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
-
যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থায়ী ক্ষতি: সাময়িকভাবে রেলপথ মেরামত করা গেলেও, দুই নদী মিশে গেলে দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের মূল সড়ক ও রেল যোগাযোগ চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
আরও পড়ুনঃ “ভেঙে পড়তে নেই, হেরে যেতে নেই!” সততা ও লড়াইয়ের দিশারী ‘উদয়ণ পণ্ডিতদের’ উদ্দেশ্যে বিনম্র প্রণাম বঙ্গবার্তার
সংকটের ঐতিহাসিক নেপথ্য ও বিশেষজ্ঞ অভিমত
নদী বিশেষজ্ঞ কৌশিক চক্রবর্তীর মতে, এই দুর্যোগের মূল বীজ বোনা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা জলচুক্তির পর থেকে:
| সময়কাল ও ঘটনা | নদী ও পরিবেশের ওপর প্রভাব |
| ফরাক্কা বাঁধ ও জলচুক্তি (১৯৯৬) | ফরাক্কা বাঁধ তৈরির পর কলকাতা বন্দরকে জল দেওয়ার পাশাপাশি জলচুক্তির শর্ত মেনে বাংলাদেশকে জল ছাড়া শুরু হয়। এর পরপরই নদীর উজান বা আপস্ট্রিমে চর বা পলি জমতে শুরু করে। |
| ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি | ডাউনস্ট্রিমে জলপ্রবাহ শুকিয়ে যাওয়া এবং উজানে পলি জমে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে বিগত কয়েক বছর ধরে ফরাক্কা অঞ্চলে নদীভাঙন চরম আকার ধারণ করেছে। |
| ভবিষ্যৎ আশঙ্কা | দেড় কিলোমিটারের অবশিষ্ট ডাঙ্গাটুকু গ্রাস করলে পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক অর্থনীতি ভেঙে পড়বে এবং সমগ্র অঞ্চলের জনসংখ্যা ও সম্পদ জলে তলিয়ে যাবে। |
রেল কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে লাইন সংস্কার করলেও, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সেচ দফতর যৌথভাবে স্থায়ী বাঁধ ও নদীভাঙন রোখার কড়া পদক্ষেপ না নিলে ফরাক্কার এই ধস এক বিশাল জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।


