বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক:
পৃথিবীর নিকটতম প্রতিবেশী লালগ্রহ মঙ্গলকে (Mars) ঘিরে বিজ্ঞানীদের কৌতূহল অনন্ত। মঙ্গলে জল ও অতীতের প্রাণের অস্তিত্বের খোঁজে গবেষণার মাঝেই সামনে এল এক নতুন ও বিস্ময়কর তথ্য। আমেরিকার অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে যে, মঙ্গল গ্রহের দক্ষিণ গোলার্ধের অভ্যন্তর ভাগ উত্তরের তুলনায় বহুগুণ বেশি উত্তপ্ত। বাইরে সূর্যরশ্মির কারণে নয়, বরং গ্রহটির ভূত্বকের গভীরে বা ‘ম্যান্টলে’ লুকিয়ে রয়েছে এই বিরাট তাপীয় অসঙ্গতি (Thermal Anomaly)। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার’ (Nature)-এ প্রকাশিত হয়েছে গবেষণার এই ফলাফল।
আরও পড়ুনঃ ১০৮ বছরের ঐতিহ্যে নজিরবিহীন সংকট; বাগবাজার সার্বজনীনের দুর্গাপুজো হবে তো?
গবেষণার মূল প্রাপ্তি ও টাইডাল টোমোগ্রাফি
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যালেক্সান্ডার বার্ন মঙ্গল গ্রহের অভ্যন্তরীণ গঠন অনুসন্ধানে মহাকর্ষীয় পরিবর্তনের সূক্ষ্ম ডেটা ব্যবহার করে ‘টাইডাল টোমোগ্রাফি’ (Tidal Tomography) নামক বিশেষ মডেল প্রয়োগ করেছেন:
-
উষ্ণতার বিশাল ফারাক: ভূত্বকের গভীরে মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধের তাপমাত্রা উত্তর গোলার্ধের চেয়ে প্রায় ২০০° থেকে ৪০০° সেলসিয়াস বেশি।
-
গলিত শিলার উপস্থিতি: ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণাংশের গভীরে বহু প্রকোষ্ঠে এখনও অত্যন্ত উষ্ণ শিলা বা ম্যাগমা গলিত অবস্থায় রয়ে গেছে।
-
বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বৈষম্য: মঙ্গলের উত্তরে রয়েছে নিচু সমভূমি, অন্যদিকে দক্ষিণে বিশাল পর্বতমালা ও গিরিখাত। এ বার জানা গেল, শুধু বাইরে নয়, মঙ্গলের পেটের ভেতরেও দুই গোলার্ধ সম্পূর্ণ আলাদা।
আরও পড়ুনঃ কয়লার ভাঁড়ার তলানিতে! উৎসবের মরশুমে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা
পুরানো দুই ধাঁধার সমাধান
দক্ষিণ গোলার্ধের এই অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ উষ্ণতার খোঁজ মেলায় বিজ্ঞানীদের কাছে আটকে থাকা দুটি প্রাচীন রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে:
| জটিল বিজ্ঞানভিত্তিক ধাঁধা | নতুন তাপীয় গবেষণার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা |
| অদ্ভুত চৌম্বকীয় নকশা (Magnetic Pattern) | মঙ্গলের দক্ষিণের লৌহ খনিজগুলিতে এক অদ্ভুত চৌম্বকীয় নকশা দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ম্যান্টলের এই অতিরিক্ত উত্তাপই প্রাচীন চৌম্বকক্ষেত্রকে দীর্ঘকাল ধরে শক্তিশালী করে রেখেছিল। |
| ইনসাইট ল্যান্ডারের (InSight) তরঙ্গ ক্ষয় | নাসার ল্যান্ডারের তথ্যে দেখা গিয়েছিল, মঙ্গলের ভূকম্পীয় তরঙ্গ দক্ষিণে পৌঁছলেই দ্রুত শক্তি হারায়। ভূগর্ভের এই উচ্চ তাপমাত্রাই তরঙ্গ দুর্বল হওয়ার আসল কারণ বলে স্পষ্ট হয়েছে। |
কেন এত উত্তপ্ত দক্ষিণ গোলার্ধ? বিজ্ঞানীদের ৩টি মূল তত্ত্ব
মঙ্গলের দক্ষিণ দিকটা কেন ভিতর থেকে এত বেশি গরম হলো, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে প্রধানত ৩টি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:
১. মহাজাগতিক সংঘর্ষ তত্ত্ব: অতীত কোটি কোটি বছর আগে উত্তর গোলার্ধে সুবিশাল কোনো মহাজাগতিক বস্তুর আছড়ে পড়ার ফলে যে প্রচণ্ড তাপের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা পরোক্ষভাবে দক্ষিণে গিয়ে জমা ও ঘনীভূত হয়।
২. অভ্যন্তরীণ ম্যান্টল প্রক্রিয়া: দক্ষিণ গোলার্ধের ম্যান্টলের গভীরে এমন কোনো প্রাক-ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া সক্রিয়, যা নিচ থেকে ক্রমাগত তাপকে ওপরের দিকে ঠেলে আটকে রাখছে।
৩. পুরু ভূত্বকের ‘হিট ট্র্যাপ’: দক্ষিণের অত্যন্ত পুরু শিলাস্তর ও ভূত্বক এক ধরনের থার্মাল ব্ল্যাঙ্কেট বা তাপ-রোধী দেওয়াল হিসেবে কাজ করে, যার ফলে স্বাভাবিক নিয়মে গ্রহটি শীতল হতে পারেনি।
মহাকর্ষীয় তথ্যের বিশ্লেষণ যত নিখুঁত হবে, মঙ্গলের রহস্যময় সৃষ্টি ও বিবর্তনের ইতিহাস ঠিক ততটাই সহজ হবে বলে মনে করছেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা।


